Saturday, September 19, 2026
WA
Home Bangla পড়লে পড়ো, না হয় গাছে চড়ো

পড়লে পড়ো, না হয় গাছে চড়ো

0
46
পড়লে পড়ো, না হয় গাছে চড়ো
পড়লে পড়ো, না হয় গাছে চড়ো

পড়লে পড়ো, না হয় গাছে চড়ো

সুরাজ পাল

স্কটল্যান্ড। আকাশটা সেখানে বেশিরভাগ সময় মেঘে ঢাকা। উনিশ শতকের শেষ দিক। ১৮৮৩ সাল। ফরফার নামের এক ছোট্ট শহরে জন্ম নিলেন নীল। বাবা হেডমাস্টার। রাশভারী লোক। মা-ও ভীষণ কড়া। পরিবারে হাসি-ঠাট্টা বারণ। ধর্মভীরু ক্যালভিনিস্ট পরিবার। পান থেকে চুন খসলেই শাস্তি। পড়াশোনায় নীল খুব যে ভালো, তা নয়। বাবার ক্লাসে বসে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন। এই বুঝি বেত নেমে আসবে পিঠে! বাবা ভাবতেন, শাসন ছাড়া মানুষ হয় না। বেত না মারলে বখে যাবে ছেলে। নিলের পিঠে সেই বেতের দাগ শুধু চামড়ায় নয়, মনের গভীরেও বসে গিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন, ভয় দেখিয়ে অঙ্ক শেখানো যায়, ব্যাকরণ গেলানো যায়, কিন্তু মানুষ তৈরি করা যায় না। ভয় শুধু ভণ্ডামি শেখায়। শিশু তখন মিথ্যা কথা বলে বাঁচার জন্য। মনে মনে নীল পণ করলেন, ‘বড় হয়ে আমি যা-ই হই, বাবার মতো মাস্টার হব না।‘

অথচ, পেটের দায়ে সেই শিক্ষকতাতেই আসতে হল। প্রথম জীবনে নীলও সাধারণ মাস্টারমশাইদের মতোই ছিলেন। হাতে বেত নিতেন। ধমক দিতেন। যদিও মনটা খচখচ করত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপরাধী লাগত। তারপর এল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ সাল। ইউরোপ জুড়ে মড়ক। হাজার হাজার তরুণ মারা যাচ্ছে ট্রেঞ্চে। নীল ভাবলেন, এই যে এত ‘সুশিক্ষিত’ মানুষ, যারা স্কুলে ফার্স্ট হয়েছে, তারা কেন যুদ্ধ থামাল না? কেন তারা একে অপরকে মারতে ছুটল? বুঝলেন, এই প্রচলিত শিক্ষা পচে গেছে। এই শিক্ষা শুধু আজ্ঞাবহ দাস তৈরি করে। ওপরওয়ালা হুকুম দেবে, আর নিচে সব ‘ইয়েস স্যার’ বলে মানুষ মারবে। যুদ্ধ শেষে নীল ঠিক করলেন, ‘অনেক হয়েছে। এবার নতুন কিছু করতে হবে। এমন স্কুল চাই, যেখানে বাচ্চারা যুদ্ধ করতে শিখবে না, ভালোবাসতে শিখবে।‘

১৯২১ সাল। প্রথমে জার্মানি, তারপর অস্ট্রিয়া, শেষে ইংল্যান্ডের নির্জন গ্রাম লেইস্টন। সেখানেই তৈরি হল সামারহিল। চারদিকে জঙ্গল। মাঝখানে একটা লাল ইটের বাড়ি। নীল বললেন, ‘এটা স্কুল নয়। এটা জীবন। এখানে বই পড়ার চেয়ে জীবন পড়া বেশি জরুরি।‘ স্কুলের নিয়মটা শুনে সবাই আকাশ থেকে পড়ল। ক্লাসে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। সকালবেলা ঘন্টা বাজে। কিন্তু সেটা ক্লাসে ঢোকার জন্য নয়, ঘুম থেকে ওঠার জন্য। তারপর? তারপর তোমার ইচ্ছে। তুমি অঙ্ক ক্লাসে যেতে পারো। লাইব্রেরিতে গল্প পড়তে পারো। মাঠে ফুটবল খেলতে পারো। পুকুরপাড়ে বসে মাছ ধরতে পারো। কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করবে না – ‘খোকন, তুমি কেন ক্লাসে আসোনি?’ নীল বিশ্বাস করতেন, ‘জোর করে শেখানো আর ধর্ষণের মধ্যে কোনো তফাত নেই।‘ শিখতে হবে ভেতর থেকে। খিদে পেলে মানুষ যেমন খায়, জানার খিদে পেলে তবেই সে পড়বে।

বাইরে থেকে যারা আসত, তারা তো অবাক! এ কী! বাচ্চারা সারাদিন হুল্লোড় করছে! গাছে চড়ছে! সাইকেল চালাচ্ছে! এরা শিখবে কবে? বড় হয়ে তো সব মূর্খ হবে। নীল হাসতেন। পাইপে টান দিয়ে বলতেন, ‘আপনারা শুধু বইটাকেই পড়া ভাবেন, এই যে ছেলেটা সাইকেলের চেন সারাচ্ছে, ও পদার্থবিজ্ঞান শিখছে না? এই যে ওরা দল বেঁধে নাটক করছে, সাহিত্য শিখছে না?’ সামারহিলে একটা ছেলে ছিল। নাম টম। সে কিছুতেই ক্লাসে যেত না। টানা দশ বছর সে শুধু ওয়ার্কশপে কাজ করল। কাঠ কাটল, লোহা পিটল। এক বর্ণও শিখল না। সবাই বলল, ‘গেল ছেলেটা। বখে গেল।‘ সতেরো বছর বয়সে হঠাৎ টম এসে নীলকে বলল, ‘নীল, আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।‘ নীল বললেন, ‘বেশ তো। কিন্তু তার জন্য তো অঙ্ক আর ফিজিক্স লাগবে। পড়তে হবে।‘ টম বলল, ‘আমি রাজি।‘ বিশ্বাস করবেন না, যে ছেলে দশ বছরে বই ছোঁয়নি, সে মাত্র দু’বছরে সব পড়া শেষ করে ফেলল। কারণ এবার সে ‘চাইছে’। তার লক্ষ্য ঠিক হয়ে গেছে। নীল বলতেন, ‘যে শিশু খেলতে জানে না, সে বাঁচতেও জানে না।‘

সামারহিলের সবচেয়ে বড় জাদুর নাম শনিবারের মিটিং। সপ্তাহে একদিন সন্ধেবেলা সবাই হলঘরে জড়ো হয়। সেখানে নীলও বসেন। রাঁধুনিও বসেন। ছ’বছরের বাচ্চাটাও বসে। স্কুল কীভাবে চলবে, তা ঠিক হয় এখানে। মজার ব্যাপার, ভোটের দাম সবার সমান। হেডমাস্টার নীলের ভোটের দাম ‘এক’। ওই ছ’বছরের বাচ্চাটার ভোটের দামও ‘এক’। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সব সিদ্ধান্ত হয়। একবার ভোটাভুটি হল স্কুলে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হবে কি না? নীল ধূমপান পছন্দ করতেন। কিন্তু বাচ্চারা ভোট দিয়ে তাঁকে হারিয়ে দিল। নীল হাসিমুখে মেনেও নিলেন। শিশু যখন দেখে তার মতের দাম হেডমাস্টারের সমান, তখন তার আত্মবিশ্বাস কোথায় গিয়ে পৌঁছায়! এটাই আসল গণতন্ত্র। বইয়ে পড়া ‘সিভিকস’ নয়, এ হল যাপনের গণতন্ত্র। এখানে বাচ্চারা শেখে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। আমি ততক্ষণই স্বাধীন, যতক্ষণ না আমার কাজ অন্যের ক্ষতি করছে।

নীল বলতেন, ‘শিশুরা দুষ্টু হয়ে জন্মায় না। ওরা অসুখী হলেই দুষ্টুমি করে।‘ যেসব বাচ্চাকে অন্য স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, বাবা-মায়েরা হাল ছেড়ে দিয়েছে, তারা আসত সামারহিলে। চোর, মিথ্যেবাদী, মারকুটে বাচ্চারা। নীল তাদের কোনোদিন বকতেন না। উপদেশ দিতেন না। তিনি ব্যবহার করতেন অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব। একবার এক ছেলে বারবার পয়সা চুরি করত। নীল তাকে ডাকলেন। বকলেন না। উল্টে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দিলেন। বললেন, ‘তোমার টাকার দরকার? এই নাও।‘ ছেলেটা হাঁ হয়ে গেল! যে চুরির জন্য মার খাওয়ার কথা, সেখানে পুরস্কার, তার চুরির নেশাটাই কেটে গেল। সে বুঝল, এই লোকটা তো আমার শত্রু নয়, আমাকে ভালোবাসে। নীলের ভাষায়, ‘সমস্যাগ্রস্ত শিশু বলে কিছু নেই; আছে শুধু সমস্যাগ্রস্ত অভিভাবক আর সমস্যাগ্রস্ত মানবসমাজ।‘ তিনি ওদের মনের জট খুলতেন। তাঁর ঘরটা ছিল সবসময় খোলা। বাচ্চারা যখন খুশি ঢুকে পড়ত। তাঁকে নাম ধরে ডাকত, স্যার নয়, হুজুর নয়। শুধুই নীল।

সেকালের সমাজ ছিল ভিক্টোরিয়ান সংস্কারে আচ্ছন্ন। শরীর ও যৌনতা নিয়ে কথা বলা পাপ। নীল সেই দেওয়াল ভেঙে চুরমার করে দিলেন। তিনি বললেন, ‘শরীরটা লজ্জার নয়। শরীরটা স্বাভাবিক।‘ শিশুরা যদি কৌতুহলবশত নিজেদের শরীর দেখে বা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাহলে সেটাকে পাপ বলা যায় না। বরং, যৌনতাকে গোপন করলেই মনের অসুখ বাড়ে। ধর্মশিক্ষাও তুলে দিলেন। বললেন, ‘ঈশ্বরভীতির চেয়ে মানবপ্রেম অনেক বড় ধর্ম।‘ চার্চ গেল ক্ষেপে। সমাজ ছি-ছি করল। পত্রিকায় লেখা হল ‘সামারহিল শয়তানের আখড়া। ওখানে বাচ্চারা বুনো হয়ে যাচ্ছে।‘ নীল গ্রাহ্য করলেন না। তিনি জানতেন, তিনি সত্যের পথে আছেন। তিনি চেয়েছিলেন ‘সুখী’ মানুষ গড়তে, ‘ভদ্র’ মুখোশধারী মানুষ নয়।

ব্রিটিশ সরকার বারবার চোখ রাঙিয়েছে। একবার সরকারি ইনস্পেক্টর এলেন স্কুল পরিদর্শনে। ভেবেছিলেন, দেখবেন নরক গুলজার। বাচ্চারা মারামারি করছে, পড়াশোনার বালাই নেই। গিয়ে দেখলেন উল্টো ছবি। হ্যাঁ, বাচ্চারা ইউনিফর্ম পরে নেই, ধুলোমাখা। কিন্তু তাদের চোখেমুখে অদ্ভুত দীপ্তি। ইনস্পেক্টর ক্লাসে ঢুকে অবাক। বাচ্চারা শিক্ষকের সঙ্গে তর্ক করছে। নির্ভয়ে প্রশ্ন করছে। অন্য স্কুলে ইনস্পেক্টর দেখলে বাচ্চারা ভয়ে চুপ করে যায়। এখানে বাচ্চারা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কে? তোমার হ্যাটটা তো বেশ মজার!’ ইনস্পেক্টর রিপোর্টে লিখলেন, ‘এদের পুঁথিগত বিদ্যা হয়তো কম, কিন্তু এদের ব্যক্তিত্ব, সাহস আর সততা যেকোনো পাবলিক স্কুলের ছেলের চেয়ে বেশি।‘ বন্ধ করা গেল না সামারহিল। সত্যের জোর বড় বেশি।

অনেকে নীলকে প্রশ্ন করত, ‘আপনার ছাত্ররা বড় হয়ে কী হয়েছে? কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে?’ নীল বিরক্ত হতেন। তিনি বলতেন, জীবন কি শুধু ক্যারিয়ার? জীবন কি শুধুই টাকা? তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “একজন মানসিক রোগগ্রস্ত প্রধানমন্ত্রী তৈরি করার চেয়ে, আমার স্কুল থেকে একজন সুখী ঝাড়ুদার বের হোক।“ তিনি বলতেন, ডাক্তার হওয়া সহজ, সুখী হওয়া কঠিন। সামারহিল সেই কঠিন কাজটাই করত। সেখান থেকে বেরিয়ে কেউ হয়েছে বিজ্ঞানী, কেউ শিল্পী, কেউ হয়তো সাধারণ মিস্ত্রি। কিন্তু তারা সবাই একটা জিনিস শিখেছে, কীভাবে বুক ফুলিয়ে বাঁচতে হয়। কীভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। বয়স বাড়ল নীলের। চুল পেকে সাদা। মনের তেজ কমল না। ১৯৭৩ সাল। নব্বই বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। যদিও সামারহিল থামল না। নীলের মেয়ে জো হাল ধরলেন। আজও সেই স্কুল আছে। ঠিক একই নিয়মে চলছে। আজও সেখানে ক্লাসে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আজও সেখানে ছ’বছরের বাচ্চার ভোটের দামে হেডমিস্ট্রেসের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

ফ্রয়েবেল দিয়েছিলেন বাগান। মন্তেস্বরি দিয়েছিলেন গুছিয়ে কাজ করার আনন্দ। নীল দিলেন মুক্তি। তিনি বললেন, শিশুর ওপর বিশ্বাস রাখো। ওরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বোঝে। আমরা বড়রা নিজেদের ভয়, নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শিশুদের ওপর চাপিয়ে দিই। আর বলি ‘তোমার ভালোর জন্যই করছি।‘ তিনি শেখালেন, শিক্ষা মানে বই গেলা নয়, শিক্ষা মানে নিজেকে চেনা। আজকের দিনে, যখন বাচ্চাদের পিঠে ইয়া বড় বইয়ের ব্যাগ, যখন নম্বরের ইঁদুর দৌড়ে শৈশব পিষে মরছে, তখন এ. এস. নীল বড় প্রাসঙ্গিক। তিনি দূর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে হয়তো মিটিমিটি হাসছেন আর বলছেন, ‘ভয় পেয়ো না। ওদের ডানাটা কেটে ফেলো না। উড়তে দাও। আকাশটা অনেক বড়।‘ সামারহিল শুধু স্কুল নয়। বিদ্রোহ। স্বপ্ন। যে স্বপ্ন বলে, মানুষ জন্মায় স্বাধীন হওয়ার জন্য, শেকলে বাঁধা পড়ার জন্য নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights