সিকি শতকে ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার সম্পাদক ফারুক আহমেদ-এর মুখোমুখি গোলাম রাশিদ
১. গোলাম রাশিদা: ভাঙড়ের প্রত্যন্ত নাটাপুকুর গ্রামের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে কলকাতার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজের স্থান করে নেওয়ার এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পেছনের মূল চালিকাশক্তি কোনটি ছিল?
ফারুক আহমেদ: এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পেছনের মূল শক্তি ছিল শেকড়ের টান এবং নিজের জাতিসত্তার প্রতি দায়বদ্ধতা। আমি গ্রামেই বেড়ে উঠেছি, সেখানকার মাটি ও মানুষের সহজ-সরল জীবন আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করতে হয় জীবনের চড়াই-উতরাই ও এর গতিপথ। পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব ও প্রতিকূল পরিবেশে বসবাস করার পরেও মনের মধ্যে একটি বাসনা দিবানিশি তাড়িত করতো। সেই তাড়না পরবর্তীতে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ করেছে। অতঃপর বাঙালির বিবেক ও জাতিসত্তার অন্বেষণ করার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, সেটিই আমাকে মফস্বলে থেকেও মূলধারার সাহিত্যাঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছে।
২. প্রশ্ন: আপনি উল্লেখ করেছেন পত্রিকা প্রকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে আপনার মা নিজের গয়না বন্ধক রেখেছিলেন— একজন তরুণ সম্পাদকের আদর্শিক যাত্রায় পরিবারের এই আবেগঘন সমর্থনের গুরুত্বকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
উত্তর: পরিবারের সমর্থন ছাড়া আদর্শের লড়াইয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। কারণ পরিবার হল জীবনের পাঠশালা। এই পাঠশালার প্রকৃত শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমার করণীয় উপাদেয় নির্ধারিত হয়েছে। তাইতো বলতে হয়, আমার মা ফজিলা বেগম কেবল আমাকে জন্মই দেননি, বরং তিনি আমার স্বপ্নেরও জন্মদাত্রী। আর্থিক দৈন্যতার দিনে তাঁর গয়না বন্ধক রাখার ঘটনাটি জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে আমাকে প্রচণ্ড জেদী করে তুলেছিল। আজও আমার স্ত্রী মৌসুমী বিশ্বাস এবং কন্যা রাইসা নূরের সহযোগিতা আমাকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগায়। তাদের অবদানকে আমি গুরুত্বের সাথে সম্মান জানাই। আমি পরিবারের কাছ থেকে যা পাই সেটিই আমার অনন্ত প্রাপ্তি।
৩. প্রশ্ন: বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার পরেও কেন আপনি পেশা বা নেশা হিসেবে সমাজ সচেতনতামূলক সাহিত্য ও সম্পাদনার জগতকে বেছে নিলেন?
উত্তর: বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে সমাজকে বিশ্লেষণ করা যায়, আর সাহিত্য দিয়ে সমাজকে সহজলভ্য উপায়ে দর্শন করা সম্ভব। সে কারণে ছাত্রজীবন থেকে আমি কবিতাপ্রেমি ছিলাম। বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলামের জাগরণী কবিতাগুলো আমাকে উদ্দীপ্ত করত। ফলে সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি টান আমার ব্যক্তিগত জীবনে মজ্জাগত একটি বিষয় হয়ে দেখা দেয়। পেশা হিসেবে বসন্তপুর এডুকেশন সোসাইটিতে কাজ করলেও, নেশা হিসেবে মানুষের আত্মমর্যাদার কথা বলতে সাহিত্য ও সম্পাদনার মতো অলাভজনক একটি বিষয়কে বেছে নিয়েছি।
৪. প্রশ্ন: ‘উদার আকাশ’ নামটির পেছনে কী বিশেষ কোনো দর্শন বা গ্রামবাংলার অবারিত উদার প্রকৃতির কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
উত্তর: অবশ্যই। আমার বেড়ে ওঠা গ্রাম নাটাপুকুর ছিল যেন শ্যামলীমায় ঘেরা এক নীবিড় অরণ্য। যা সবুজের সমারোহ আর অসীম আকাশের নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাবৈচিত্র্যে ঢাকা। সেখান থেকেই ‘উদার আকাশ’ নামটির অনুপ্রেরণা। এটির দার্শনিক দিকটি হলো—মানবিকতা ও মূল্যবোধের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। ‘উদার আকাশ’ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা বর্ণের আবরণে আবদ্ধ নয়, বরং এটি উদার জীবনের অন্বেষণ ও সুস্থসমাজ গড়ার এক অনন্য প্রত্যয়।
৫. প্রশ্ন: শুরুতে পরিচিত মানুষদের তাচ্ছিল্য এবং আর্থিক অনটন সত্ত্বেও প্রায় তিন দশক ধরে একটি লিটল ম্যাগাজিনকে আন্তর্জাতিক মানের রিসার্চ জার্নালে রূপান্তর করার বিষয়টি আপনি কীভাবে বজায় রাখলেন?
উত্তর: আমি বিশ্বাস করি ‘সবুরে মেওয়া ফলে’। পরিচিত মানুষদের তাচ্ছিল্য আমাকে থামিয়ে দেওয়ার বদলে আরও সচেতন ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছিল। ‘উদার আকাশ’ পত্রিকাটি ২০০২ সালে যখন শুরু করি, তখন টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করতাম। আজ এটি দেশ-বিদেশে (ISSN 2320-3498) এক অন্যতম রিসার্চ জার্নাল পরিচিত। এই তিন দশকের সাহিত্য সফর ধৈর্য আর সততাই ছিল আমার প্রধান ‘মটো’। স্মর্তব্য যে, মৌলিক এবং মানসম্মত লেখা প্রকাশ ও স্বজনপ্রীতিকে আমলে না নেওয়ার কারণে লিটল ম্যাগাজিনকে জার্নালে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে।
৬. প্রশ্ন: আপনার মতে, দেশভাগ পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি মুসলমান সমাজের যে মেধা ও মননের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, ‘উদার আকাশ’ সেই শূন্যস্থান পূরণে কতটা সফল হতে পেরেছে?
উত্তর: দেশভাগের পর এই বঙ্গে মুসলমান সমাজ অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল। বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, ‘উদার আকাশ’ তা দূর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আমি কেবল বাহাবা পাবার আশায় পত্রিকা প্রকাশ করি না, বরং অনগ্রসর এই সমাজকে মূলস্রোতে ফেরানোর নিমিত্তে নিরলস এই প্রচেষ্টা। এমন প্রচেষ্টার কারণে তথ্যনির্ভর ১৫২টির অধিক গ্রন্থ প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। সে কারেণে উভয় বাংলার সাহিত্যিপ্রেমি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ‘উদার আকাশ’ প্রকাশনা মানুষের মেধা ও মনন চর্চার শূন্যতা পূরণে সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ। বিধায় ‘উদার আকাশ’ জার্নাল ও প্রকাশনাটি সর্বস্তরের সাহিত্যপ্রেমি মানুষের নিকট আজ আস্থার এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। এখানেই আমি আমার শ্রমের সার্থকতা দেখি।
৭. প্রশ্ন: ঐতিহাসিক খাজিম আহমেদের মতো গবেষকদের কাজ প্রকাশ করার মাধ্যমে আপনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সঠিক ইতিহাস চর্চার যে বার্তা দিচ্ছেন, বর্তমান সময়ে তা কতটা প্রাসঙ্গিক বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: বর্তমানে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতার দিনে খাজিম আহমেদের মতো গবেষকদের কাজ ভীষণ জরুরি। তাঁর লেখনীতে পক্ষপাতহীন ইতিহাস ফুটে ওঠে, যা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের দূরত্ব ঘোচাতে সাহায্য করে। সঠিক ইতিহাস চর্চা ছাড়া একটি জাতির মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আমি বিশ্বাস করি, বিভেদকামী অশুভ শক্তির পতন ঘটাতে মানবিক সাহিত্যের কোনো বিকল্প নেই। যে সাহিত্যে মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ অধিক, সে সাহিত্য তত সমৃদ্ধ। যার নিদর্শন খাজিম আহমেদ।
৮. প্রশ্ন: একজন প্রকাশক হিসেবে আপনি ‘প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া’ মানুষের কথা বার বার বলেছেন— বর্তমান কর্পোরেট প্রকাশনা সংস্কৃতির যুগে ছোট প্রকাশনাগুলো কীভাবে তাদের এই স্বতন্ত্র লড়াই জারি রাখতে পারে?
উত্তর: কর্পোরেট যুগে টিকে থাকতে হলে ছোট প্রকাশনাগুলোকে সততা আর লেখার গুণগত মানের ওপর জোর দিতে হবে। আমি অর্থের লোভে পা না দিয়ে উপেক্ষিত ও অনগ্রসর শ্রেণির অভাব-অনুযোগের কথা তুলে ধরছি। আমার পাশে মোস্তাক হোসেনের মতো সমাজসেবী দাঁড়িয়েছেন। মানুষের হৃদয়ে জায়গা করতে পারলে এবং নির্মোহ আবেদন নিয়ে কাজ করলে ক্ষুদ্র প্রকাশনাও বিশাল পরিচিতি পেতে পারে।
৯. প্রশ্ন: স্কুল-কলেজের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে পত্রিকা বের করার সেই দিনগুলোর তুলনায় বর্তমানের ডিজিটাল যুগের পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর লড়াইটা আপনার কাছে কতটা ভিন্ন মনে হয়?
উত্তর: প্রযুক্তির কারণে পৌঁছানো সহজ হয়েছে, কিন্তু পাঠকদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে পত্রিকা বের করার মধ্যে যে আবেগ আর নিবিড় যোগসূত্র ছিল, এখনকার ডিজিটাল যুগে তা যান্ত্রিকতা পেয়েছে। তবে ‘উদার আকাশ’ আজও পাঠকের সাংস্কৃতিক দরজায় সাহিত্যের আলো পৌঁছে দিতে আগের মতোই নিরলস পরিশ্রম করছে।
১০. প্রশ্ন: আগামী দিনে ‘উদার আকাশ’ কি কেবল একটি প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে থাকবে, নাকি এটিকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার আছে?
উত্তর: ‘উদার আকাশ’ কেবল একটি নাম বা স্লোগান নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ গড়ার এক অনন্য অঙ্গীকার। আগামীতে আমি ‘উদার আকাশ’কে আরও বড় মাপের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নিয়ে যেতে চাই। আমার লক্ষ্য হলো ঘরে ঘরে সাহিত্যের আলো পৌঁছে দেওয়া এবং অনগ্রসর জাতির প্রাপ্য অধিকার ও আত্মমর্যাদার সন্ধান করা। ভারত-উপমহাদেশের শান্তি ও সহিষ্ণুতা বজায় রাখতে ‘উদার আকাশ’ বেঁচে থাকবে সচেতন মানুষের মধ্যে— এটি আমার একান্ত কামনা ও বাসনা।















