স্মার্ট স্টেশন, মসৃণ সফর: পূর্ব রেলের ভোলবদল বদলে দিচ্ছে যাত্রার অভিজ্ঞতা
কলকাতা, ৭ এপ্রিল, ২০২৬:
শাশ্বতী বসু (নাম পরিবর্তিত) আজও দু’বছর আগের ডানকুনি স্টেশনের সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার কথা ভুলতে পারেন না, যেটিকে তিনি রসিকতা করে ‘প্ল্যাটফর্ম দৌড়’ বলে ডাকেন। হাতে দু’টো ভারী ব্যাগ, আর প্ল্যাটফর্মে কোনও ‘কোচ ইন্ডিকেশন বোর্ড’ না থাকায় তিনি ভুল দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ট্রেন আসতেই কামরা ধরার জন্য ভিড়ের মধ্যে দিয়ে প্রায় ২০০ মিটার দৌড়াতে হয়েছিল তাঁকে। শাশ্বতী স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম, খুব বিরক্ত লাগছিল এবং প্রায় ট্রেনটা ছেড়েই দিচ্ছিল।” আজ সেই অভিজ্ঞতার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। একটি উজ্জ্বল ডিজিটাল ডিসপ্লের নিচে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে তিনি এখন জানেন ঠিক কোথায় তাঁর কামরাটি থামবে। শাশ্বতীর কথায়, “মনে হচ্ছে স্টেশনটা এবার আমার সাথে কথা বলছে। আর কোনও অনুমান নয়, আর কোনও দৌড়াদৌড়ি নেই।”
শাশ্বতীর এই স্বাচ্ছন্দ্যের নেপথ্যে রয়েছে পূর্ব রেলের এক বিশাল প্রযুক্তিগত ভোলবদল। গত এক বছরে, পূর্ব রেল একগুচ্ছ ডিজিটাল সরঞ্জাম চালু করেছে যা যাত্রীদের হাতের মুঠোয় রিয়েল-টাইম তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে। এই বছরের অন্যতম বড় পদক্ষেপ হলো ইলেক্ট্রনিক সাইনবোর্ড বা ট্রেনের সূচক বোর্ডের আধুনিকীকরণ। গত বছর যেখানে ১৭টি স্টেশনে এই ব্যবস্থা ছিল, এই বছর হাওড়ার আরামবাগ, সমুদ্রগড়, বলাগড়; মালদার ধুলিয়ান গঙ্গা এবং শিয়ালদহের কল্যাণী ঘোষপাড়ার মতো মোট ২৭টি স্টেশনে নতুন ট্রেন ইন্ডিকেশন বোর্ড (TIB) বসানো হয়েছে। শাশ্বতীর মতো সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে ধুলিয়ান গঙ্গা ও ডানকুনি প্ল্যাটফর্মে বসানো হয়েছে উচ্চ-দৃশ্যমানতাসম্পন্ন কোচ ইন্ডিকেশন বোর্ড (CIB), যার ফলে যাত্রীরা সহজেই তাঁদের নির্দিষ্ট কামরা খুঁজে পাচ্ছেন।
স্টেশনগুলি এখন আরও বেশি প্রাণবন্ত এবং তথ্যবহুল হয়ে উঠছে। রামপুরহাট বা নিউ ফারাক্কার যাত্রীরা এখন স্টেশনে বিশাল ভিডিও ওয়াল দেখতে পাবেন। অন্যদিকে মালদা টাউন, জামালপুর ও সুলতানগঞ্জের মতো স্টেশনের এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জ এবং ওয়েটিং হলগুলোতে ৩১টি আধুনিক এলইডি টিভি (LED TV) লাগানো হয়েছে, যা প্রতিনিয়ত যাত্রার আপডেট এবং বিনোদন প্রদান করছে। স্টেশনের ঘোষণাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ; গত বছরের মাত্র ৪টি স্টেশনের তুলনায় এই বছর ১৭টি স্টেশনে অটো অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেম উন্নত করা হয়েছে, যাতে অস্পষ্ট মাইকের কারণে কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাত্রীদের কান এড়িয়ে না যায়।
শুধুমাত্র স্ক্রিন বা পর্দার মধ্যেই এই উন্নয়ন সীমাবদ্ধ নেই; পূর্ব রেল আধুনিক প্রযুক্তির সাথে ধ্রুপদী স্থাপত্যের মেলবন্ধন ঘটাচ্ছে। শিয়ালদহ ডিভিশনের ভ্যাবলা এবং খিদিরপুরের মতো ছোট হল্ট স্টেশনসহ মোট ২৩টি স্টেশনে জিপিএস-সিঙ্ক্রোনাইজড ঘড়ি বসানো হয়েছে, যাতে সময়ের নিখুঁত হিসাব বজায় থাকে। এছাড়া পানাগড়, সীতারামপুর এবং সিউড়ির মতো ৯টি স্টেশনে বসানো হয়েছে সুদৃশ্য টাওয়ার ক্লক, যা একইসাথে প্রয়োজনীয় ঘড়ি এবং স্থানীয় ল্যান্ডমার্ক হিসেবে কাজ করছে।
পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার শ্রী মিলিন্দ দেউস্কর জানিয়েছেন যে, তাঁদের লক্ষ্য হলো প্রতিটি যাত্রীকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর পরিবেশ উপহার দেওয়া, যাতে ছোট স্টেশনগুলোতেও যাত্রীরা বিশ্বমানের সুবিধা পান। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শ্রী শিবরাম মাঝি বলেন যে, এই পরিকাঠামো উন্নয়ন যাত্রার অভিজ্ঞতাকে সহজ করার প্রতি রেলের অঙ্গীকারের প্রমাণ। এতে স্টেশনে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই যাত্রীরা এক নিরবচ্ছিন্ন, তথ্যসমৃদ্ধ এবং চাপমুক্ত ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন।



















