তৃষ্ণা নিবারণ, শীতল সফর: তীব্র গরমে যাত্রীদের স্বস্তি দিতে ২৪x৭ কাজ করছে পূর্ব রেল
By Antara Tripathy
কলকাতা, ৩ জুন ২০২৬:
গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তাপমাত্রার পারদ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী, তখন লক্ষ লক্ষ রেলযাত্রীর স্বস্তি নিশ্চিত করতে এক নিরবচ্ছিন্ন মানবিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে পূর্ব রেল। ঠান্ডা পানীয় জল, উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপেক্ষাকক্ষ এবং আধুনিক যাত্রীসুবিধা—সব মিলিয়ে যাত্রীদের জন্য আরও আরামদায়ক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা গড়ে তুলতে দিনরাত কাজ করছেন রেলের কর্মীরা।
নৈহাটি থেকে শিয়ালদহগামী এক নিত্যযাত্রী সুমন দাস (নাম পরিবর্তিত) বলেন, “কয়েক বছর আগেও এই গরমে ট্রেনে যাতায়াত করা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। প্ল্যাটফর্মে ঠান্ডা জল পাওয়া যেত না। এখন প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনেই সহজে ঠান্ডা জল পাওয়া যাচ্ছে। যাত্রীদের কথা সত্যিই ভাবা হচ্ছে বলে মনে হয়।”
যাত্রীদের এই স্বস্তির পেছনে রয়েছে পূর্ব রেলের বৃহৎ পরিকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচি। জেনারেল ম্যানেজার শ্রী মিলিন্দ দেওস্করের নেতৃত্বে বিভিন্ন ডিভিশনে দ্রুতগতিতে স্থাপন করা হচ্ছে নতুন ওয়াটার কুলার এবং অন্যান্য যাত্রীসুবিধা।
জলসেবায় নতুন রেকর্ড
পূর্ব রেলের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ২৮৪টি নতুন ওয়াটার কুলার স্থাপনের মাধ্যমে মোট কার্যকর ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১৮-তে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে আরও ১০০টি নতুন ইউনিট স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে সেই লক্ষ্যপূরণের পথে অভূতপূর্ব অগ্রগতি দেখা গেছে। শুধু ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেই রেকর্ড ৮৭টি নতুন ওয়াটার কুলার স্থাপন করা হয়েছে, যা যাত্রীসুবিধা সম্প্রসারণে পূর্ব রেলের অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে।
শিয়ালদহ ডিভিশনে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াটার কুলার
শিয়ালদহ ডিভিশনে সম্প্রতি ১২০ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ছয়টি নতুন ওয়াটার কুলার চালু করা হয়েছে। এগুলি স্থাপন করা হয়েছে—
- এনকেজি কারশেডে ২টি
- ফুলিয়ায় ১টি
- রানাঘাটের CRE হেলথ ইউনিটে ১টি
- বারাকপুর আরপিএফ ব্যারাকে ২টি
এর পাশাপাশি রানাঘাট স্টেশনে একটি পুরোনো ইউনিট প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, কাঁচরাপাড়া ওয়ার্কশপে ইতিমধ্যেই ৩২টি ১২০-লিটার ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াটার কুলার যাত্রী ও কর্মীদের সেবা দিয়ে চলেছে।
আসানসোলে হাই-টেক জল সরবরাহ ব্যবস্থা
আসানসোল ডিভিশনে চালু হয়েছে ৩৬টি নতুন প্রজন্মের হাই-টেক ওয়াটার কুলার। প্রতিটি ইউনিটের ঠান্ডা জল সরবরাহ ক্ষমতা ১৫০ লিটার এবং বিশুদ্ধকরণ ক্ষমতা ১২০ লিটার। বিভিন্ন স্টেশন ও পরিষেবা ভবনে স্থাপিত এই কুলারগুলি গ্রীষ্মের সময় যাত্রীদের জন্য বড় স্বস্তি এনে দিচ্ছে।
মালদা ডিভিশনে জল ও শীতলতার দ্বৈত উদ্যোগ
মালদা টাউন ডিভিশনে খলতিপুর এবং ধুলিয়ান গঙ্গা স্টেশনে ১৫০ লিটার ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি নতুন ওয়াটার কুলার স্থাপন করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, যাত্রীদের আরাম আরও বাড়াতে জঙ্গিপুর রোড স্টেশনের নবনির্মিত অমৃত ভারত স্টেশন স্কিম (ABSS) ভবনে পাঁচটি স্প্লিট এয়ার কন্ডিশনারও বসানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ফার্স্ট ক্লাস ওয়েটিং রুমে ২টি
- রিজার্ভ লাউঞ্জে ১টি
- এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জে ১টি
- স্টেশন সুপারিনটেনডেন্টের চেম্বারে ১টি
ফলে যাত্রীরা এখন গরমের হাত থেকে সাময়িক স্বস্তি নিয়ে অপেক্ষার সময় কাটাতে পারছেন আরও আরামদায়ক পরিবেশে।
‘যাত্রীসেবাই আমাদের অগ্রাধিকার’
পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক (CPRO) শ্রী শিবরাম মাঝি বলেন,
“আমাদের প্রতিটি উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন যাত্রীরা। জেনারেল ম্যানেজার শ্রী মিলিন্দ দেওস্করের নেতৃত্বে পূর্ব রেলের বিভিন্ন ডিভিশনের কর্মীরা ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন কাজ করে চলেছেন যাত্রীদের জন্য উন্নত পরিষেবা নিশ্চিত করতে। গ্রীষ্মের এই কঠিন সময়েও আমরা চাই যাত্রীরা যেন স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা এবং মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে সফর করতে পারেন।”
মানবিক রেলের এক নতুন দৃষ্টান্ত
তাপপ্রবাহের এই সময় পূর্ব রেলের উদ্যোগ শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং যাত্রীকেন্দ্রিক এক মানবিক দর্শনেরও প্রতিফলন। স্টেশনজুড়ে ঠান্ডা পানীয় জলের সহজলভ্যতা, উন্নত অপেক্ষাকক্ষ এবং আধুনিক যাত্রীসুবিধা নিশ্চিত করে পূর্ব রেল প্রমাণ করছে—রেলযাত্রা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়, বরং যাত্রীদের আরাম ও কল্যাণ নিশ্চিত করারও একটি দায়িত্ব।
গরম যতই বাড়ুক, পূর্ব রেলের বার্তা স্পষ্ট—যাত্রীদের স্বস্তি নিশ্চিত করতে তাদের প্রচেষ্টা থেমে নেই, চলবে নিরবচ্ছিন্নভাবে।















