শ্যমাপ্রসাদ বিশ্বভারতীকে বাঁচিয়েছিলেন, সে কাহিনী আমরা কি জানি?
অমিত গোস্বামী
বাংলা এবং বাঙালির প্রতিনিধিঃ
গত কয়েকবছরে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে চর্চা চলছে। তার আগে বামপন্থীরা ও তাদের কুৎসিত সংস্করণ পরবর্তী শাসকরা শ্যামাপ্রসাদকে ভুলিয়ে দেওয়ার ও প্রয়োজনে বদনাম করার ভয়ংকর প্রচেষ্টা করে গেছে নিরন্তর। কিন্তু চিত্তরঞ্জন এবং সুভাষচন্দ্র ছাড়া শ্যামাপ্রসাদের মতো আর একজন ব্যক্তিত্বের নাম কি মনে পড়ে ভারতীয় রাজনীতিতে যাঁর বাংলা এবং বাঙালির প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসটা এমন উজ্জ্বল ছিল ? শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে আমরা যা চর্চা করি তার প্রথমটির বিষয় অবশ্যই বঙ্গভঙ্গ, দ্বিতীয়টি ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ। কিন্তু যেটা করি না তা হল তৎকালীন আইনসভায় পেশ হওয়া বিশ্বভারতী-বিল (১৯৫০) পেশ ও শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা।
পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির জানা গল্পঃ
পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি নিয়ে ১১।৪।১৯৪৭ তারিখে মাউন্টব্যাটেনকে ছোটলাট বারোজ এক রিপোর্টে জানালেন “শরৎচন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লক ও কম্যুনিস্টরা দেশভাগের (বঙ্গভাগ) বিরোধী কিন্তু সংখ্যাগুরু হিন্দু জনমত তাদের কথা শুনতে রাজি নয়। কারণ হিন্দু মহাসভার ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন – “প্রদেশটিকে বিভক্ত করা ব্যতীত বাংলার সাম্প্রদায়িক সমস্যার অন্য কোনো সমাধান আমি কল্পনা করতে পারি না…” এবং এটাই এখন বেশিরভাগ বাঙালির মত।“ আমরা জানি যে স্বাধীন যুক্তবঙ্গের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদের আন্দোলন ফলপ্রসু হয়। বিধানচন্দ্র রায় এবং কিরণশঙ্কর রায়ের সমর্থন আসে। এই আন্দোলনের পিছনে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, রমেশ মজুমদার, যদুনাথ সরকার, শিশিরকুমার মিত্র আর মেঘনাদ সাহার মতো বিদ্বজ্জনেদেরও অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল; আর ছিল অধিকাংশ হিন্দু বাঙালির নৈতিক সমর্থন। ফলে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসাবে আজ পশ্চিমবঙ্গের মর্যাদা।
এক আইন ও পতাকার দাবিতে কাশ্মীরেঃ
দ্বিতীয় প্রসঙ্গ অর্থাৎ ৩৭০ ধারা ও কাশ্মীর আন্দোলন: ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো কাশ্মীরেও একই আইন ও পতাকার দাবিতে তিনি সংবিধানের ৩৭০ ধারার বিশেষ সুবিধার তীব্র বিরোধিতা করেন, কারণ তাঁর মতে এটি বিচ্ছিন্নতাবাদকে প্রশ্রয় দেয়। এই আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি জম্মুতে গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৩ সালের ২৩শে জুন বন্দিদশাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।এটাও চর্চিত। আমরা জানি।
বিশ্বভারতী-বিল (১৯৫০) –
তৃতীয় প্রসঙ্গ যেটা খুব কম আলোচিত সেটা বিশ্বভারতী-বিল (১৯৫০)। ১৯।২।১৯৪০-এ বিদায়-মুহূর্তে গান্ধিজীকে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী সম্পর্কে একটি আবেদনপত্র দেন। বিশ্বভারতী সম্পর্কে কবির ভাবনার সারাৎসার –”বিশ্বভারতী হলো এমন এক তরীর মতো, যা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদের ভার বহন করে চলেছে।” কাজেই একে রক্ষা করতে হবে। দীর্ঘ সাত বছর পরে স্বাধীনতার পরেই গান্ধিজী ভারতের শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে এর দ্রুত সমাধান করতে বলেন। অবশেষে Visva-Bharati Bill (1950) আইনসভার কক্ষে পেশ করা হল (28-4-1951) । বিলটি নিয়ে আইনসভায় তুমুল বিতর্ক হয়। বিতর্কে বিশ্বভারতীর প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, অ্যাকাডেমিক বিষয়, রবীন্দ্রনাথের আদর্শ, ধর্ম সম্পর্কে ভাবনা উঠে আসে।
রবীন্দ্রনাথের ভাবনার পক্ষে শ্যামাপ্রসাদঃ
বিতর্কে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ভাষণে বিলটিতে প্রস্তাবিত বিশ্বভারতীর অ্যাকাডেমিক অধিকার নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। শ্যামাপ্রসাদ প্রশ্ন তোলেন বিলটিতে কী করে শুধুমাত্র কলেজ এবং উচ্চতর শিক্ষাকে বিশ্বভারতীর পঠনপাঠনের এক্তিয়ারভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে বিশ্বভারতীর শিক্ষার একেবারে নীচু স্তর থেকে বিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষার বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই চলে যাবে পশ্চিম বঙ্গীয় বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে। এমন সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে সেখানে ঘটে যাবে শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মূল আশা-আদর্শ-ভাবনার চরমতম বিচ্যুতি। তিনি তার ভাষনে বলেন “বিশ্ববিদ্যালয়কে কলেজ ও ভবন বা ছাত্রাবাসগুলি পরিচালনার অথবা স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়গুলির ঠিক কী অবস্থান হবে? এই বিলটি স্পষ্টতই কলেজগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার অর্থ ম্যাট্রিকুলেশন স্তরের পরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে পাস হওয়া মাধ্যমিক শিক্ষা বিল অনুযায়ী, রাজ্যের সমস্ত উচ্চ বিদ্যালয় পর্ষদের (বোর্ডের) নিয়ন্ত্রণে আসবে। তাহলে শান্তিনিকেতনে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলির কী হবে? আমি সুনিশ্চিতভাবে এই মত পোষণ করি যে, বিশ্বভারতীকে যদি কিন্ডারগার্টেন স্তর থেকে নিজস্ব বিদ্যালয় পরিচালনার অধিকার দেওয়া না হয়, তবে এই বিল এবং বিশ্বভারতী—উভয়ই চরমভাবে ব্যর্থ হবে। শান্তিনিকেতনে এক অভিনব ধারার মাধ্যমিক শিক্ষাদান করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক বিশেষ অবদান।“
বিরোধীদের প্রতি শ্যামাপ্রসাদের সিংহগর্জণঃ
যারা আর পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে বিশ্বভারতীকে ফেলতে চেয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে শ্যামাপ্রসাদের সিংহগর্জণ ছিল এরকম – “”প্রতিষ্ঠাতার উদ্দেশ্যগুলিকে সংশোধন করা আমাদের কাজ নয়। তা করার কোনও অধিকার আমাদের নেই। আপনারা যদি বলেন যে আপনারা এই উদ্দেশ্যগুলি স্বীকার করেন না, তবে বিলটি পাস করবেন না এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতীর যে উদ্দেশ্য বা আদর্শ হওয়া উচিত বলে মনে করেছিলেন, সেই আদর্শের ভিত্তিতে সরকার বিশ্বভারতী বিলটি পাস করতে প্রস্তুত নয়…” মৌলানা আজাদ শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্যের যৌক্তিকতাকে মান্যতা দিয়ে বললেন “বিলটি প্রস্তুত হয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এবং সেখানে ‘স্কুল’ শব্দটির উল্লেখ ছিল না। অর্থাৎ পেশ করা বিলে শুধু কলেজ এবং উচ্চতর শিক্ষার প্রসঙ্গই আসছে!” ভাগ্যিস শ্যামাপ্রসাদ আপত্তি তুললেন, তা না হলে তো নিঃশব্দে ঘটে যাচ্ছিল এক সর্বনাশা কাণ্ড! বিশ্বভারতী-বিল থেকে স্কুল শব্দটির বর্জন – অর্থাৎ বিশ্বভারতীতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার কোনো সুযোগ না থাকা আর রবীন্দ্রনাথের ‘life’s best treasure’কে নর্দমায় নিক্ষেপ করার ব্যাপারটা একই।
রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নসৌধ রক্ষার নায়কঃ
যে আত্মিক তৃপ্তির অন্বেষণে বোলপুরের রুক্ষ প্রান্তরে অশেষ ত্যাগ ও রিক্ততাকে সঙ্গী করে রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বপ্নের শিক্ষাসৌধ গড়ে তুলেছিলেন, যার জন্য তাঁকে স্ত্রীর শেষ সম্বল গয়নাটুকুও বিকিয়ে দিতে হয়েছিল—স্বাধীন ভারতে আইনের বেড়াজালে, কলমের এক নির্মম খোঁচায় ‘জাতীয় সম্পত্তি’-র দোহাই দিয়ে সেই সৃষ্টির চূড়া ভেঙে দেওয়ার এক অবিবেচক ও অপরিণামদর্শী প্রয়াস শুরু হয়েছিল। সেই আঘাতের বিরুদ্ধে সেদিন যে সময়োচিত ও বলিষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ, তাকে আজ কেবলই ‘হিন্দুত্বের’ সঙ্কীর্ণ তকমা পরিয়ে অস্বীকার বা অমর্যাদা করা কি আদৌ ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হতে পারে?
@followersSamik BhattacharyaSuvendu Adhikari#BJP4IND#ShyamaPrasadMukherjee#RabindranathTagore#viswahinduparishad#shantiniketan



















