উত্তমকুমার: এক শতকের আলোয় বাংলা সিনেমার চিরন্তন মহানায়ক
জন্মশতবর্ষে স্মরণে — সুমন মুন্সি, IBG NEWS
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিছু নাম কেবল অভিনেতার পরিচয় বহন করে না—তারা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের আবেগ, একটি সমাজের নান্দনিক স্মৃতি, একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ। উত্তমকুমার তেমনই এক নাম।
জন্মশতবর্ষের প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার জীবনী পুনরাবৃত্তি করা নয়। বরং ফিরে দেখা এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রাকে—যেখানে কলকাতার স্টুডিওপাড়া, মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বপ্ন, প্রেমের নীরবতা, শহুরে বিষণ্ণতা, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং রুপোলি পর্দার মোহ এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা হয়ে গিয়েছিল।
উত্তমকুমার সেই সুতোয় বাঁধা সবচেয়ে উজ্জ্বল গিঁট।
জন্ম ও প্রয়াণ
- জন্ম: ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, কলকাতা
- প্রয়াণ: ২৪ জুলাই ১৯৮০, কলকাতা
- বয়স: ৫৩ বছর
- পারিবারিক নাম: অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়
জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমারকে স্মরণ তাই শুধুমাত্র একজন প্রয়াত অভিনেতাকে স্মরণ করা নয়। এটি এমন এক শিল্পীকে পুনরাবিষ্কার করা, যাঁর অভিনয় আজও বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক চেতনায় জীবন্ত।
শুরুটা ছিল সহজ নয়
আজকের কিংবদন্তির আড়ালে ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের একটি অধ্যায়। উত্তমকুমারের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায়। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়।
সিনেমায় তাঁর পথচলা শুরু থেকেই সাফল্যের ছিল না। পরপর ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কঠিন লড়াই তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যর্থতাই হয়তো তাঁকে শিখিয়েছিল পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু সংলাপ বলতে হয় না—একজন মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়।
তাঁর অভিনয়ের পরিণতিতে এই মানবিক বোধই ক্রমে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছিল।
‘উত্তম’ হয়ে ওঠার আগে
চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম দিককার কাজ দর্শকের বিশেষ সাড়া পায়নি। সেই সময় তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়নি আজকের মতো তারকার আভা। বরং তিনি ছিলেন বহু সংগ্রামী শিল্পীর একজন, যাঁকে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়েছিল ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং ক্রমাগত আত্মপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন বাংলা চলচ্চিত্রের ভাষাকেও বদলে দিতে শুরু করে।
‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সেই পরিবর্তনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। আর তারপর ‘অগ্নিপরীক্ষা’ উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটিকে বাঙালির সাংস্কৃতিক কল্পনায় প্রায় কিংবদন্তির মর্যাদায় পৌঁছে দেয়।
এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
উত্তম–সুচিত্রা: পর্দার প্রেম থেকে সাংস্কৃতিক মিথ
বাংলা সিনেমায় বহু জুটি এসেছে, বহু জুটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের যুগল উপস্থিতি আলাদা এক অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল।
তাঁদের পর্দার সম্পর্ক শুধু প্রেমের গল্প ছিল না। সেখানে ছিল দৃষ্টি, বিরতি, অভিমান, সংযম, সামাজিক সংকোচ এবং না-বলা কথার এক আশ্চর্য ব্যাকরণ।
‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘শিল্পী’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘সপ্তপদী’—এমন বহু ছবিতে তাঁদের অভিনয় বাঙালির প্রেমের কল্পনাকে নতুন ভাষা দিয়েছিল।
তাঁদের জনপ্রিয়তার রহস্য কেবল সৌন্দর্য বা রোম্যান্টিক আবহে ছিল না।
বরং তাঁরা পর্দায় এমন এক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে ভালোবাসা কখনও উচ্চকণ্ঠ নয়; অনেক সময় একটি দৃষ্টি, একটি নীরবতা কিংবা একটি অসমাপ্ত বাক্যই হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ সংলাপ।
মহানায়ক: নাম নয়, একটি সাংস্কৃতিক অভিধা
‘মহানায়ক’ শব্দটি উত্তমকুমারের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই বিশেষণটি প্রায় স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠে।
কিন্তু মহানায়ক হওয়া মানে কেবল অসংখ্য দর্শকের প্রিয় হয়ে ওঠা নয়।
একজন সত্যিকারের মহানায়ক তাঁর সময়ের মানুষের স্বপ্নকে অভিনয় করেন।
উত্তমকুমার সেই কাজটি করেছিলেন।
তিনি ছিলেন বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষের আকাঙ্ক্ষা ও সংকোচের এক অভিনয়-প্রতিমূর্তি। কখনও তিনি প্রেমিক, কখনও স্বামী, কখনও বিদ্রোহী, কখনও ব্যর্থ মানুষ; কখনও আবার এমন এক চরিত্র, যার ভেতরে বাহ্যিক আত্মবিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর একাকিত্ব।
এই বহুমাত্রিকতাই তাঁকে কেবল ‘রোম্যান্টিক হিরো’ হয়ে থাকার সীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছিল।
রোম্যান্সের বাইরে অন্য এক উত্তম
উত্তমকুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—তাঁকে শুধুমাত্র প্রেমের নায়ক হিসেবে আটকে রাখা যায় না।
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে তিনি অরিন্দম মুখার্জির চরিত্রে যে অভিনয় করেছিলেন, তা তাঁর শিল্পীসত্তার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকার বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে জমে থাকা অপরাধবোধ, ভয়, অনিশ্চয়তা এবং আত্মজিজ্ঞাসাকে তিনি এমন সংযত অভিনয়ে প্রকাশ করেছিলেন যে চরিত্রটি উত্তমকুমারের নিজস্ব তারকাসত্তার সঙ্গেও এক অদ্ভুত সংলাপ তৈরি করে।
সেখানে উত্তম আর কেবল নায়ক নন।
তিনি হয়ে ওঠেন নিজেরই নির্মিত মিথের মুখোমুখি দাঁড়ানো এক মানুষ।
এ কারণেই ‘নায়ক’ আজও তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
‘চিড়িয়াখানা’ থেকে ‘সপ্তপদী’—বৈচিত্র্যের বিস্তার
রহস্য, সামাজিক নাটক, প্রেম, পারিবারিক কাহিনি, সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র—বিভিন্ন ধারায় উত্তমকুমার নিজের অভিনয়ের পরিসর প্রসারিত করেছিলেন।
সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’-য় ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্রেও তাঁর অভিনয় তাঁর বহুমুখী সক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
এখানে প্রেমিক উত্তম নেই।
আছেন অনুসন্ধিৎসু, সংযত, পর্যবেক্ষণশীল এক চরিত্রাভিনেতা।
অর্থাৎ একই শিল্পীর মধ্যে যেন একাধিক অভিনয়-স্বভাব পাশাপাশি বাস করত।
বাংলা ভাষা, উচ্চারণ এবং শরীরী অভিনয়ের নিজস্ব ছন্দ
উত্তমকুমারের অভিনয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সংলাপ বলার স্বাভাবিকতা।
তিনি সংলাপকে কেবল শব্দ হিসেবে উচ্চারণ করতেন না; তার সঙ্গে যুক্ত করতেন বিরতি, স্বর, চোখের ভাষা এবং শরীরের সামান্যতম পরিবর্তন।
তাঁর হাসি ছিল সংলাপের মতোই অর্থবহ।
তাঁর নীরবতাও ছিল সংলাপের মতোই শ্রুতিময়।
একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো তখনই, যখন দর্শক তাঁর অভিনয়কে অভিনয় বলে ভুলে গিয়ে চরিত্রটিকেই সত্য বলে মেনে নেয়।
উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে সেই বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম ভিত্তি।
স্টারডমের ভিতরে মানুষটি
তারকার জীবন বাইরে থেকে যতটা উজ্জ্বল, ভিতরে ততটাই কঠিন হতে পারে।
উত্তমকুমারের ক্ষেত্রেও জনপ্রিয়তার সঙ্গে এসেছিল বিপুল প্রত্যাশা। দর্শক তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শিল্পীর দায়িত্ব ছিল সেই ছাঁচ ভাঙা।
তিনি সেই চেষ্টা করেছিলেন।
তাঁর পরবর্তী অভিনয়জীবনে চরিত্রের বৈচিত্র্য, প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং নিজের শিল্পীসত্তাকে নতুনভাবে পরীক্ষা করার প্রবণতা প্রমাণ করে যে তিনি শুধুমাত্র তারকা হয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না।
তিনি ছিলেন একজন ক্রমাগত অনুসন্ধানরত শিল্পী।
উত্তমকুমার ও বাঙালির নস্টালজিয়া
কেন এত বছর পরেও উত্তমকুমারকে ঘিরে আবেগ এত প্রবল?
কারণ উত্তমকুমার কেবল চলচ্চিত্রের পর্দায় ছিলেন না।
তিনি ঢুকে পড়েছিলেন বাঙালির পারিবারিক স্মৃতিতে।
পুরনো রেডিওর গান, সিনেমা হলের অন্ধকার, সাদা-কালো ছবির ফ্রেম, পুজোর ছুটিতে সিনেমা দেখা, প্রেমপত্রের ভাষা, রবিবারের বিকেলের অলসতা—এসবের সঙ্গে কোথাও না কোথাও মিশে আছে তাঁর উপস্থিতি।
একটি প্রজন্ম তাঁকে নায়ক হিসেবে দেখেছে।
পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে দেখেছে ইতিহাস হিসেবে।
আর আজকের প্রজন্ম তাঁকে আবিষ্কার করছে একটি সাংস্কৃতিক phenomenon হিসেবে।
জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমারকে নতুন করে দেখা
জন্মশতবর্ষ কোনও শিল্পীকে শুধু স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি তাঁকে পুনরায় মূল্যায়নেরও সময়।
উত্তমকুমারকে তাই শুধু ‘মহানায়ক’ বলে স্মরণ করলে তাঁর শিল্পীসত্তার অনেকটাই অনুচ্চারিত থেকে যায়।
তাঁকে দেখতে হবে বাংলা চলচ্চিত্রের পরিবর্তনের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী হিসেবে।
তিনি এমন এক সময়ে উঠে এসেছিলেন যখন বাংলা সিনেমা নিজস্ব দর্শকভাষা নির্মাণ করছিল। সাহিত্য, সংগীত, নাট্যরীতি এবং শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের অভিজ্ঞতা একত্রিত হয়ে তৈরি করছিল একটি স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি।
সেই নির্মাণের কেন্দ্রে উত্তমকুমারের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
শতবর্ষ পেরিয়েও কেন তিনি প্রাসঙ্গিক?
কারণ সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, অভিনয়ের ধরন বদলায়—কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, একাকিত্ব, স্বপ্ন, ব্যর্থতা ও ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বদলায় না।
উত্তমকুমারের অভিনয়ের মূল শক্তি ছিল সেই মানবিক অনুভূতিগুলিকে পর্দায় স্পর্শযোগ্য করে তোলা।
তাই তাঁর চলচ্চিত্র পুরনো হলেও অনুভূতিগুলি পুরনো হয় না।
আজকের দর্শক তাঁর ছবিতে শুধু একটি অতীত সময়কে দেখে না; নিজের আবেগেরও কিছু প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়।
শেষ দৃশ্যে যে আলো নিভে না
উত্তমকুমার চলে গিয়েছেন বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর প্রস্থান তাঁর উপস্থিতিকে শেষ করতে পারেনি।
বরং কখনও কখনও একজন শিল্পীর মৃত্যুর পরই তাঁর শিল্প সময়ের সঙ্গে এক নতুন জীবন লাভ করে।
উত্তমকুমারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
তিনি আজ আর কেবল একজন অভিনেতার নাম নন।
তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনুভূতিশীল উচ্চারণ।
তিনি এক প্রজন্মের প্রেমের মুখ।
এক শহরের নস্টালজিয়া।
এক ভাষার পর্দার সৌন্দর্য।
এক শিল্পের জনমানসে প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তি।
আর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে ফিরে তাকালে হয়তো সবচেয়ে যথার্থ কথাটি এটাই—
উত্তমকুমার কোনও অতীতের মানুষ নন; তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে চলমান এক বর্তমান।
জউত্তমকুমারের সেরা ১০ জনপ্রিয় ও বক্স অফিস-সফল ছবি
যে চলচ্চিত্রগুলি তাঁকে করে তুলেছিল বাংলা সিনেমার চিরন্তন মহানায়ক
উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি শুধু একজন তারকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা জনপ্রিয় সিনেমার এক যুগের নির্মাতা। তাঁর ছবির সাফল্য শুধু টিকিট বিক্রির অঙ্কে মাপা যায় না। দর্শকের দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসা, প্রেক্ষাগৃহে ছবির সাফল্য, পুনঃপ্রদর্শনে জনপ্রিয়তা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে তাঁর ‘মহানায়ক’ পরিচয়।
তবে একটি সম্পাদনাগত সতর্কতা জরুরি। ১৯৫০–৭০-এর দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য বক্স অফিস সংগ্রহের পরিসংখ্যান আজকের মতো সংরক্ষিত নেই। তাই নিচের তালিকাটিকে নির্দিষ্ট অর্থে ‘সর্বোচ্চ আয়কারী’ হিসেবে না দেখে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিকভাবে সফল উত্তমকুমার অভিনীত চলচ্চিত্রের একটি নির্বাচিত তালিকা হিসেবে দেখা উচিত।
| ক্রম | চলচ্চিত্র | সাল | প্রধান অভিনয়শিল্পী | পরিচালক |
|---|---|---|---|---|
| ১ | সপ্তপদী | ১৯৬১ | উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, ছবী বিশ্বাস, ছায়া দেবী | অজয় কর |
| ২ | হারানো সুর | ১৯৫৭ | উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, উৎপল দত্ত | অজয় কর |
| ৩ | সাগরিকা | ১৯৫৬ | উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, কমল মিত্র | অজয় কর |
| ৪ | অগ্নিপরীক্ষা | ১৯৫৪ | উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, মঞ্জু দে, উৎপল দত্ত | অগ্রদূত |
| ৫ | ইন্দ্রাণী | ১৯৫৮ | উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, উৎপল দত্ত | নীরেন লাহিড়ী |
| ৬ | চাওয়া-পাওয়া | ১৯৫৯ | উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, তুলসী চক্রবর্তী | তরুণ মজুমদার |
| ৭ | গৃহদাহ | ১৯৬৭ | উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, প্রদীপকুমার | সুব্রত সেন |
| ৮ | অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি | ১৯৬৭ | উত্তমকুমার, তনুজা, ছায়া দেবী | সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় |
| ৯ | ছদ্মবেশী | ১৯৭১ | উত্তমকুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, তরুণকুমার, জহর রায় | অগ্রদূত |
| ১০ | অমানুষ | ১৯৭৫ | উত্তমকুমার, শর্মিলা ঠাকুর, উৎপল দত্ত | শক্তি সামন্ত |
১. সপ্তপদী — ১৯৬১
পরিচালক: অজয় কর
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, ছবী বিশ্বাস, ছায়া দেবী
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য অবলম্বনে নির্মিত সপ্তপদী বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় প্রেমকাহিনি। কৃষ্ণেন্দু ও রীনা ব্রাউনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রেম, ধর্ম, সামাজিক মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়ের জটিলতা ছবিটিকে নিছক রোম্যান্টিক চলচ্চিত্রের সীমা অতিক্রম করেছিল।
উত্তম–সুচিত্রা জুটির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে আজও ছবিটি দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।
২. হারানো সুর — ১৯৫৭
পরিচালক: অজয় কর
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, উৎপল দত্ত
স্মৃতি হারানো এক মানুষের জীবন এবং ভালোবাসার পুনরাবিষ্কারের গল্প হারানো সুর।
উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের অভিনয় এবং ছবির আবেগঘন সংগীত এটিকে বাংলা চলচ্চিত্রের চিরন্তন জনপ্রিয় ছবিগুলির একটি করে তোলে।
“তুমি যে আমার”— গানটি আজও এই ছবির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
৩. সাগরিকা — ১৯৫৬
পরিচালক: অজয় কর
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, কমল মিত্র
উত্তম–সুচিত্রা যুগের প্রথম দিকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য সাগরিকা।
এই সময়েই উত্তমকুমারের জনপ্রিয়তা দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল এবং সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন বাংলা দর্শকের মধ্যে এক নতুন ধরনের তারকাখ্যাতির জন্ম দিচ্ছিল।
৪. অগ্নিপরীক্ষা — ১৯৫৪
পরিচালনা: অগ্রদূত
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, মঞ্জু দে, উৎপল দত্ত
অগ্নিপরীক্ষা উত্তমকুমার–সুচিত্রা সেন জুটির ইতিহাসে একটি বিশেষ মাইলফলক।
এই ছবির সাফল্য তাঁদের জুটিকে বাংলা জনপ্রিয় সংস্কৃতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পরবর্তী দশকে তাঁদের একের পর এক সাফল্যের ভিত তৈরি হয় এই সময়েই।
৫. ইন্দ্রাণী — ১৯৫৮
পরিচালক: নীরেন লাহিড়ী
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, উৎপল দত্ত
প্রেম, বিবাহ এবং সামাজিক বাস্তবতার টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে নির্মিত ইন্দ্রাণী উত্তম–সুচিত্রা যুগের আরেক উল্লেখযোগ্য ছবি।
এই সময়ে উত্তমকুমার শুধুমাত্র রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে নয়, মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনযাত্রা ও আবেগের এক বিশ্বাসযোগ্য প্রতিচ্ছবি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিলেন।
৬. চাওয়া-পাওয়া — ১৯৫৯
পরিচালক: তরুণ মজুমদার
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, তুলসী চক্রবর্তী
হালকা মেজাজের রোম্যান্টিক কমেডি চাওয়া-পাওয়া দেখিয়েছিল যে উত্তমকুমারের জনপ্রিয়তা শুধুমাত্র গম্ভীর প্রেমের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়।
তাঁর হাস্যরস, শরীরী অভিনয় এবং সুচিত্রা সেনের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত রসায়ন ছবিটিকে দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলে।
৭. গৃহদাহ — ১৯৬৭
পরিচালক: সুব্রত সেন
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, প্রদীপকুমার
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যজগতের সঙ্গে যুক্ত গৃহদাহ উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এখানে তাঁর চরিত্রে প্রেমের পাশাপাশি মানসিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৮. অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি — ১৯৬৭
পরিচালক: সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, তনুজা, ছায়া দেবী
এটি উত্তমকুমারের ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী চরিত্রাভিনয়।
পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত বাংলার লোককবি ও গায়ক অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের পরিচিত রোম্যান্টিক নায়ক-ইমেজের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গিয়েছিলেন।
এই অভিনয়ের জন্য তিনি ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির জন্য যৌথভাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার স্বীকৃতি পান। এর ফলে তাঁর শিল্পীসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জাতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৯. ছদ্মবেশী — ১৯৭১
পরিচালনা: অগ্রদূত
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, তরুণকুমার, জহর রায়
উত্তমকুমারের কমেডি অভিনয়ের অন্যতম জনপ্রিয় নিদর্শন ছদ্মবেশী।
ছদ্মবেশ, ভুল পরিচয় এবং হাস্যরসের আবর্তে নির্মিত ছবিটিতে উত্তমকুমারের অভিনয় তাঁর অন্যরকম প্রতিভাকে সামনে নিয়ে আসে।
মহানায়ক যে একই সঙ্গে অসাধারণ কমেডিয়ানও হতে পারেন, ছদ্মবেশী তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
১০. অমানুষ — ১৯৭৫
পরিচালক: শক্তি সামন্ত
অভিনয়ে: উত্তমকুমার, শর্মিলা ঠাকুর, উৎপল দত্ত
অমানুষ উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রজীবনের শেষ পর্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ।
এই ছবির মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা বাংলা ভাষাভাষী দর্শকের পরিসর ছাড়িয়ে সর্বভারতীয় বাজারেও নতুন মাত্রা পায়। শক্তি সামন্তের পরিচালনায় উত্তমকুমারের অভিনয় তাঁর তারকা-সত্তাকে আরও বৃহত্তর দর্শকের সামনে পৌঁছে দেয়।
বক্স অফিসের অঙ্কের চেয়েও বড় ছিল উত্তমকুমারের ‘দর্শক-সংগ্রহ’
উত্তমকুমারের যুগের চলচ্চিত্রের সাফল্যকে আজকের কোটি টাকার হিসাব দিয়ে বিচার করা কঠিন।
তখন ছিল না আধুনিক বক্স অফিস ট্র্যাকিং, ডিজিটাল টিকিট ডেটা কিংবা সর্বভারতীয় দৈনিক আয়ের প্রকাশিত তালিকা।
কিন্তু একটি বিষয় ইতিহাস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—
উত্তমকুমারের ছবির জন্য মানুষ প্রেক্ষাগৃহে যেত।
বারবার যেত।
একই ছবি বহুদিন চলত।
পরবর্তী প্রজন্মও সেই ছবি দেখতে চাইত।
আর এই দীর্ঘস্থায়ী দর্শক-আকর্ষণই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় ‘বক্স অফিস রেকর্ড’।
মহানায়কের উত্তরাধিকার
উত্তমকুমারের মৃত্যু ২৪ জুলাই ১৯৮০-তে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫৩।
কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের আলো নিভে যায়নি।
বরং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছবিগুলি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির আরও গভীরে।
সপ্তপদীর প্রেম, হারানো সুরের বিষাদ, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির শিল্পীসত্তা, নায়কের আত্মজিজ্ঞাসা, ছদ্মবেশীর হাসি—সব মিলিয়ে উত্তমকুমার নিজেই হয়ে উঠেছেন বাংলা সিনেমার এক বহুস্বরের ইতিহাস।
তাই তাঁর জন্মশতবর্ষে ‘সেরা দশ’ ছবির তালিকা আসলে কেবল দশটি চলচ্চিত্রের তালিকা নয়।
এটি এক শতকের স্মৃতির দরজা খুলে দেওয়া।
উত্তমকুমারকে যতবার দেখা হয়, বাঙালি যেন ততবার নিজেরই কোনও হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরে পায়।
শেষ দৃশ্যে যে আলো নিভে না
উত্তমকুমার চলে গিয়েছেন বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর প্রস্থান তাঁর উপস্থিতিকে শেষ করতে পারেনি।
বরং কখনও কখনও একজন শিল্পীর মৃত্যুর পরই তাঁর শিল্প সময়ের সঙ্গে এক নতুন জীবন লাভ করে।
উত্তমকুমারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
তিনি আজ আর কেবল একজন অভিনেতার নাম নন।
তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনুভূতিশীল উচ্চারণ।
তিনি এক প্রজন্মের প্রেমের মুখ।
এক শহরের নস্টালজিয়া।
এক ভাষার পর্দার সৌন্দর্য।
এক শিল্পের জনমানসে প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তি।
আর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে ফিরে তাকালে হয়তো সবচেয়ে যথার্থ কথাটি এটাই—
উত্তমকুমার কোনও অতীতের মানুষ নন; তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে চলমান এক বর্তমান।
✍️ সুমন মুন্সি
IBG NEWS
জন্মশতবর্ষ বিশেষ নিবন্ধ













