আমেরিকা সবপেয়েছির দেশ নয়, খেটে খাওয়ার দেশ
অমিত গোস্বামী
আমেরিকায় নাকি দুধ চাইলে ক্ষীর পাওয়া যায়ঃ
আমেরিকা আমার আগে অনেকেই এসেছেন। নায়াগ্রা, ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক সিটি, লাস ভেগাস দেখেছেন। কেউ আহা উহু করেছেন। কেউ বলেছেন, ধুসস, আমার পাড়াই ভালো। যারা কবিতা পড়তে এসেছেন, তারা দর্শকদের ছবি দেন নি, সংখ্যাল্পতা যদি ধরা পরে যায়। তবে গান গাইতে যারা এসেছেন তারা ভরা মঞ্চে হুল্লোড়ের ছবি দিয়েছেন। এ’সব থেকে আমরা একেকজন একেকভাবে কল্পনা করেছি আমেরিকাকে। তবে সবাই এটা মনে গেঁথে নিয়েছি যে এ’দেশ প্রাচুর্যের দেশ। দুধ চাইলেই ক্ষীর পাওয়া যায়।
আমেরিকা পরিযায়ী- উত্তরাধিকারীদের দেশঃ
আসলে এ’দেশটি পরিযায়ীদের উত্তরাধিকারীদের দেশ। আদি বাস ছিল রেড ইন্ডিয়ানদের যারা নিজেদের আমেরিকান ইন্ডিয়ান বলে। ইউরোপীয়রা আসার বহু বছর আগে থেকে সুমেরু প্রদেশে এস্কিমোরা ও এখানে এই রেড ইন্ডিয়ানদের বসবাস। ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকাকে ভারত ভেবে এদের নাম রেড ইন্ডিয়ান দেন। আসলে কলম্বাসের আসার ৫০০ বছর আগে অর্থাৎ ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে নাবিক লেইফ এরিকসন উত্তর আমেরিকার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে পা রাখেন। কিন্তু স্থায়ী বসতির সূত্রপাত ঘটে কলম্বাসের আমেরিকা আসার পরে।
আদিবাসী হঠিয়ে শ্বেতাঙ্গদের রাজঃ
১৬ শ ও ১৭ শ শতকে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড থেকে দলে দলে মানুষ এস বসতি স্থাপন করে। ফলে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা না থাকায় আদিবাসীদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মারা যায়। এখনও যারা আছেন তারা রেস্ট্রিকটেড এরিয়াতে বসবাস করেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে সবচেয়ে বেশি এসেছে জার্মানি থেকে, ১৮ ও ১৯ শতকে আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড থেকে ও ১৯ ও ২০ শতাব্দীতে মেক্সিকো থেকে এসে বসতি গড়েন।।তবে শ্রমিক হিসেবে আফ্রিকা থেকে আগমন নিয়মিত ছিল। অর্থাৎ এক কথায় বিভিন্ন জাতির সংকরায়নে সৃষ্ট জাতি আমেরিকানরা। অনেকটা কনভার্টেড বাঙালি মুসলিমদের মত।
ভারতীয়রা ও বাঙালিরা কবে প্রথম আসে এ’দেশে?
এবার জানতে ইচ্ছেই হতে পারে যে আমেরিকায় ভারতীয়রা কবে প্রথম এসেছিল! ঐতিহাসিক নথি অনুসারে ১৭৯০ সালে এক ভারতীয় নাবিক প্রথম আমেরিকায় পা রাখেন। নাম জানা যায়নি। তবে প্রথম বাঙালি পরিযায়ীর নাম জানা গেছে যে স্থায়ীভাবে প্রথম আমেরিকায় থাকতে শুরু করেন। তার নাম আনন্দ মোহন রায়। যাকে স্থানীয়রা ডাকতেন অলিভ আর রয় নামে। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ১৮৮৫ থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে আমেরিকায় আসেন। সিল্ক-চিকন ও সূচীশিল্পের ব্যবসা দিয়ে তার জীবিকার শুরু। তিনি হুগলি, কলকাতা ও নোয়াখালি থেকে সামগ্রী আনতেন। তিনি ব্যবসা করতেন নিউ জার্সি ও নিউইয়র্কে। কিন্তু কিছু বাঙালি ব্যবসায়ীকে তিনি একই ব্যবসার সুযোগ করে দেন নিউ অরলিন্স, বাল্টিমোর ও নিউ ইয়র্কে। তখন বর্ণবৈষম্য ও অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা আইনের জন্যে আফ্রিকান-আমেরিকান পাড়ায় থাকতে হত। শ্বেতাঙ্গ মহিলাকে বিয়ে করায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই আনন্দ মোহন বোস এক আফ্রিকান আমেরিকান মলি মিলারকে বিয়ে করেন। এখন তাদের সন্তান সন্ততি ও উত্তরপুরুষেরা মিশে গেছেন আমেরিকান সমাজে।
ভারতের কালিমাময় ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করেন স্বামী বিবেকানন্দঃ
তবে ১৮৯৩ সালে স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে যোগ দেন এবং এ’কথা বলা বাহুল্য যে ভারতের যে কালিমাময় ভাবমুর্তি ছিল এ’দেশে তা ধুয়ে মুছে অতি উজ্জ্বল চেহারা দেন সিমলে পাড়ার এই নরেন দত্ত। ১৮৯৪ সালে নিউইয়র্কে তিনি বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন যা আমেরিকায় প্রাচ্য দর্শণের প্রথম চর্চাকেন্দ্র। উইলিয়াম জোনস, নিকোলা টেসলা নামক তৎকালীন অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবি যোগ দেন এই চর্চাকেন্দ্রে। স্বামী বিবেকানন্দ সে’অর্থে সসম্মানিত আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন না। প্রায় জোর করে সভার শেষে মিনিট পাঁচেক বরাদ্দ ছিল তার জন্যে। পক্ষান্তরে ব্রাহ্মসমাজের পক্ষে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার আমন্ত্রিত ছিলেন ও অনেকটা সময় বরাদ্দ ছিল তার জন্যে। কিন্তু নাহ, তিনি কোন ছাপ রাখতে পারেন নি।
বাঙালিদের আমেরিকা আসার ঢেউঃ
বাঙালিদের আমেরিকায় আসার ঢেউ আসে ১৯৬৫ সালের পর থেকে। ‘ইমিগ্রেশন আ্যান্ড ন্যাসনালিটি অ্যাক্ট অফ ১৯৬৫’ আইনটি উচ্চদক্ষ পেশাজীবিদের জন্যে আমেরিকার দরজা খুলে দেয়। ১৯৭০/৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ ও নকশাল বিধ্বস্ত রাজ্য থেকে প্রচুর বাঙালি পাড়ি জমায় মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে, ১৯৮০ র দশকে পূর্ববর্তী অধিবাসীদের রেফারেন্সে বেশ কিছু বাঙালি পাড়ি জমান এ’দেশে, ১৯৯০ এর পরে কম্পিউটার শিপ্লে ওয়াই২কে সমস্যা ও ডট কমের হাত ধরে বাঙালি এল এই শিল্পে। তারপর থেকে প্রথমে চিকিৎসা শিল্পে বাঙালিরা এলেও পরে সফটওয়ার, রিসার্চ ও উচ্চ দক্ষতার বাঙালিরা এখানে আসতে পেরেছে। কিন্তু নাগরিকত্বের প্রশ্নে বিষয়টি কঠিন হয়েছে।
এই মুহুর্তে বাঙালির ৮০ ভাগের বেশি বাংলাদেশিঃ
এই মুহুর্তে পুরো আমেরিকায় ৪ লক্ষ বাংলাদেশি বাঙালি ও ১৫০০০০ ভারতীয় বাঙালির বাস। ধর্মের ভিত্তিতেও এই বাঙালিদের ২৫ শতাংশ হিন্দু, ৭৫ শতাংশ মুসলমান। পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী এই ২৫ শতাংশের আয় গড় আমেরিকানদের চেয়ে বেশি (১৭০০০০ ডলারের ওপরে বার্ষিক আয়)। তুলনায় বাংলাদেশি বাঙালিদের আয় গড়ে ৭৮০০০ ডলার। আসলে ভারতীয় বাঙালিতা বিশেষজ্ঞ পদে বেশি কাজ করেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক বেশি। কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালিদের রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া, বেআইনি অনুপ্রবেশ, অড জব নিয়ে নেওয়া এই বৈষম্যের কারণ।
আমেরিকায় দুর্গাপুজোর সূত্রপাতঃ
আমেরিকায় বাঙালি মানেই দুর্গাপুজো। ১৯৭০ সালে নিউইয়র্ক শহরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে প্রথম দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। উদ্যোক্তারা পরে পরিচিতি লাভ করে ইস্ট কোস্ট দুর্গাপূজা অ্যাসোসিয়েশন। পরের বছর থেকে শিকাগো শহরেও কমিউনিটি দুর্গাপূজা আয়োজিত হয়। তবে এর আগে থেকে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত বেদান্ত সোসাইটিতে আচার মেনে বহুদিন দুর্গাপুজো হচ্ছে। এই মুহুর্তে পুরো আমেরিকার ২০০ টির বেশি দুর্গাপুজো আয়োজিত হয়। নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, হিউস্টন, ডালাস, অস্টিন, ক্যালিফর্ণিয়া, ইলিনয়, বোস্টন, আ্যাটলান্টা, ক্লিভ ল্যান্ড সহ প্রচুর শহরে হই হই করে দুর্গাপুজো হয়। তবে চারদিনের পুজো নয়, এখানে বেশিরভাগ পুজো হয় শনি ও রবিবারে। পুজো আসছে, তাই দেখছি বাঙালিদের কথায় তার ছাপ পড়ছে।
লিটল লিটন বিটল নাট দেন ইটল ইটলঃ
আমেরিকায় ইংরেজি না জানলে নাকি মহাসমস্যা। মনে হচ্ছে না। কাল এক ভারতীয় দোকানে পান সাজছিলেন এক মেমসাহেব। এক বয়স্কা মহিলা তাকে সামান্য সুপারি বেশি দেওয়ার কথা বললেন এভাবে, লিটল লিটন বিটল নাট দেন ইটল ইটল।।মানে আরো সুপারি দিয়ে সাজো তারপরে তো খাবো। মেমসাহেব বুঝে গেলেন। সমস্যা কী? সমস্যা অন্য রায়গায়। সিগারেট না হয় সামান্য নিভৃতে খেলাম, কিন্তু শেষাংশ ফেলব কোথায়! যেখানে সেখানে ফেললে ১০০০ ডলার কানমলা। খালি বাক্স পকেটে নিয়ে বেরোই। এই দেশে দুটো ভাগ – ধর্মের ভিত্তিতে বা অর্থনৈতিক বা জাতিগত ভিত্তিতে নয়। পুরোটাই রাজনৈতিক। তুনি হয় ডেমোক্র্যাট, নয় রিপাবলিক। আগামী ২ নভেম্বর অন্তর্বতী নির্বাচন।। সেক্যু মাক্যুরা এখানে নেই। তবে অন্যরকমের উৎপাত আছে। আমেরিকান ফর অমেরিকানস – এই ট্রাম্পীয় স্লোগান বেশ জনপ্রিয় শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে। এরা পাঁচের ঘরের নামতা মুখস্থ বলতে জামা কাপড় নষ্ট করে, ওদিকে বলে যে অভিবাসীরা আমাদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে।
চলো নিয়মমাফিক, ডানে তাকিও না কো, বাঁয়ে তাকিও নাকোঃ
আসলে আমেরিকা সায়েন্স টেকনোলজি’র দেশ। এখানে আবিস্কার ও কারিগরি উৎকর্ষ শেষ কথা। চাকরির গ্যারান্টি তখনই যতক্ষণ কেউ প্রত্যাশার মাণ পূর্ণ রাখছে। অবশ্য শুধু তাতেই নয়। সংস্থার অর্থনৈতিক লাভ অনেকসময় মানদন্ড হয়ে দাঁড়ায়। তাই সকলেই দৌড়চ্ছে এক অদ্ভুত ইঁদুর দৌড়ে। দেশে বসে আত্মীয়রা যখন ভাবেন যে সন্তান তো বেশ আছে স্বর্গসুখে। সেই সময় সেই সন্তানের উদ্বেগ, উদয়াস্ত খাটনি, নিজেকে অতিক্রম করার নিরন্তর প্রচেষ্টা আমাদের হিসেবে থাকে না, আমরা দেখি বাড়ি, গাড়ি, ব্যাঙ্ক ব্যালান্স। সারা পৃথিবীতে এখন অটোক্রেসির জয়জয়াকার। কোথাও নিয়মের একনায়কতন্ত্র, কোথায় দলীয়। করো নইলে মরো। ভারত শক্তিশালী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আজও নিয়ম বেশ ঢিলেঢালা। আমার দেশে দেশের স্বার্থবিরোধী কথা সচ্ছন্দে বলা যায়। মুশকিল হল তার বিচার কে করবে? আদালত? সেখানে কত কেস পেন্ডিং হয়ে পড়ে থাকে। সে যাক, ভারত যতদিন পপ্যুলিস্ট রাজনীতি থেকে বেরোতে না পারবে, দান খয়রাত থেকে বেরোতে না পারবে, বিরোধী দল গঠনমূলক সমালোচনার পথ না ধরবে, ততক্ষণ ভারতের প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া অসম্ভব। আমেরিকা এসে এটাই আমার প্রথম উপলব্ধি।
Author Profile: Amit Goswami
Amit Goswami — The “Gonsai Kobi” in America

Amit Goswami, popularly referred to as “Gonsai Kobi” (গোঁসাই কবি), represents a distinctive blend of Bengali literary sensibility, cultural expression and contemporary life abroad. His journey in the United States reflects a continuing connection with Bengali identity while embracing new experiences and perspectives in American society.
Known for his poetic and creative outlook, Goswami carries the spirit of Bengali language and culture beyond geographical boundaries. His presence in the United States offers an interesting meeting point between Bengali heritage and the multicultural American experience.
Through his personality, writings and cultural engagement, Amit Goswami reflects the evolving identity of Bengali individuals living outside India—where tradition, creativity, friendship, travel and everyday experiences come together.
His photographs from the United States capture another dimension of this journey, portraying moments with family and friends, visits to American communities and everyday life across Texas.
A Bengali Voice Across Borders
For Goswami, America is not simply a destination; it is also a new canvas for observation, interaction and cultural discovery. His journey demonstrates how Bengali literary and cultural expressions can continue to evolve while remaining rooted in their original traditions.
“গোঁসাই কবি অমিত শক্তিধর মার্কিন দেশে” therefore becomes more than a caption—it reflects a cultural journey from Bengal to America, carrying language, identity and creativity across borders.
Prepared for IBG NEWS based on the information and photographs supplied for publication.



















