বাংলার ঢঙে দুর্গাপুজো আয়োজন: পরিকল্পনা থেকে বিসর্জন—কী কী করতে হবে?
অন্তরা ত্রিপাঠী | IBG NEWS BANGLA
কলকাতা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিল্প, সামাজিক মিলন এবং পারিবারিক আবেগের এক অনন্য সমন্বয়। বনেদি বাড়ির পুজো হোক কিংবা পাড়ার সর্বজনীন দুর্গোৎসব, বাংলার নিজস্ব রীতিতে পুজো আয়োজন করতে গেলে প্রয়োজন আগাম পরিকল্পনা, সঠিক পুরোহিত ও রীতিনীতি মেনে চলা, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক অনুমতি।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের AASAN Online Puja Permission Portal-ও দুর্গাপুজোর অনুমতিকে একক-জানালা ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। (AASAN)
১. প্রথমেই তৈরি করুন পুজো কমিটি
সর্বজনীন পুজোর ক্ষেত্রে সভাপতি, সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ একটি দায়িত্বশীল কমিটি তৈরি করা জরুরি।
কমিটির দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে—
- পুজো ও পুরোহিতের দায়িত্ব
- প্যান্ডেল ও সাজসজ্জা
- প্রতিমা
- বিদ্যুৎ
- নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাসেবক
- ভোগ ও প্রসাদ
- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
- হিসাবরক্ষণ
- বিসর্জন ও শোভাযাত্রা
প্রশাসনিক আবেদনেও কমিটির সভাপতি/সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। AASAN পোর্টালে সঠিক ও যাচাইযোগ্য তথ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। (AASAN)
২. জায়গা নির্বাচন ও অনুমতি
পুজোর জায়গা নির্বাচন করার আগে জমির মালিকের সম্মতি নেওয়া উচিত। AASAN-এর নথির তালিকায় Landowner NOC, Site Plan এবং আগের বছরের অনুমতিপত্র-সহ বিভিন্ন নথির উল্লেখ রয়েছে। (AASAN)
কলকাতায় প্যান্ডেল সংক্রান্ত অনুমতির জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের PWD-র পৃথক Puja Pandal Permission ব্যবস্থা রয়েছে। (PWD WB)
৩. সরকারি অনুমতি আগে, প্যান্ডেল পরে
সর্বজনীন দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি শেষ মুহূর্তে না রেখে আগেই সম্পন্ন করা ভালো।
AASAN ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে—
গত বছরের পুজোর অনুমতি • জমির NOC • বিদ্যুৎ বিল • ইলেকট্রিশিয়ানের ঘোষণা • ডেকোরেটরের ঘোষণা • Site Plan • কমিটির স্বাক্ষর • স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা • Safety Declaration • পুজোর বাজেট • বিসর্জনের Route Chart। (AASAN)
আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য ভালোভাবে পরীক্ষা করা জরুরি, কারণ AASAN-এর নিয়ম অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়ার পরে আবেদন পরিবর্তনের সুযোগ নাও থাকতে পারে। (AASAN)
৪. বাংলার ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতিমা নির্বাচন
বাংলার সাবেকি দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল একচালা প্রতিমা—যেখানে দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ একই চালচিত্রের মধ্যে থাকেন।
অবশ্য থিম পুজোয় আধুনিক একচালা বা পৃথক প্রতিমার ব্যবহারও হতে পারে। তবে যদি লক্ষ্য হয় “একেবারে বাঙালি ঘরানার দুর্গাপুজো”, তাহলে সাবেকি একচালা প্রতিমা, চালচিত্র, ডাকের সাজ বা ঐতিহ্যবাহী অলঙ্করণ বিশেষ আবহ তৈরি করতে পারে।
৫. প্যান্ডেলে রাখুন বাঙালিয়ানার ছোঁয়া
বাংলার পুজোর সৌন্দর্য শুধু বড় বাজেটের সাজসজ্জায় নয়, বরং ঐতিহ্যের উপস্থাপনায়।
ব্যবহার করা যেতে পারে—
- শোলা
- মাটির প্রদীপ
- পটচিত্র
- আলপনা
- বাঁশ ও কাপড়
- তালপাতার শিল্প
- বাংলার লোকশিল্প
- পুরনো জমিদারবাড়ির স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা
প্যান্ডেলে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি না করে প্রশস্ত প্রবেশ ও বেরোনোর পথ রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৬. পুরোহিত ও পুজোর পঞ্জিকা
বাংলা রীতিতে দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ পুরোহিতের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা করা উচিত।
মহালয়া, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী—প্রতিটি দিনের নিজস্ব আচার রয়েছে। বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস, নবপত্রিকা, অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, হোম, বলি/প্রতীকী বলির রীতি এবং বিসর্জন—পুজোর ধরন অনুযায়ী আচার নির্ধারণ করতে হবে।
তিথি ও পুজোর সময় প্রতিবছর পরিবর্তিত হয়। তাই স্থানীয় পুরোহিত এবং নির্ভরযোগ্য পঞ্জিকা অনুযায়ী সময়সূচি তৈরি করা উচিত।
৭. সপ্তমীর নবপত্রিকা—বাংলার বিশেষ ঐতিহ্য
বাংলার দুর্গাপুজোর অন্যতম পরিচিত রীতি হল নবপত্রিকা স্নান ও প্রতিষ্ঠা।
কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান—এই নয়টি উদ্ভিদকে নির্দিষ্ট আচার মেনে সাজিয়ে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়।
অনেক জায়গায় এটিকে প্রচলিতভাবে “কলাবউ” বলা হলেও নবপত্রিকার ধর্মীয় তাৎপর্য আলাদা।
৮. অষ্টমীর অঞ্জলি ও সন্ধিপুজো
অষ্টমীর অঞ্জলি বাঙালির দুর্গাপুজোর অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত।
পুজো কমিটিকে আগে থেকেই—
- ফুল ও বেলপাতা
- অঞ্জলির সামগ্রী
- পুরোহিতের প্রয়োজনীয় উপকরণ
- প্রসাদ
- ভক্তদের দাঁড়ানোর ব্যবস্থা
প্রস্তুত রাখতে হবে।
অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত সন্ধিপুজো-র সময় ও উপাচার পুরোহিতের নির্দেশ অনুযায়ী প্রস্তুত করা উচিত।
৯. ভোগে থাকুক বাঙালির স্বাদ
দুর্গাপুজোর ভোগ বাঙালির কাছে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
ঐতিহ্যবাহী নিরামিষ ভোগে থাকতে পারে—
ভাত, ডাল, লাবড়া, পাঁচরকম ভাজা, তরকারি, চাটনি, পায়েস এবং মিষ্টি।
বৃহৎ সর্বজনীন পুজোয় রান্না ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
১০. বিদ্যুৎ ও অগ্নি-নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
প্যান্ডেলের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। AASAN-এর বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ঘোষণায় licensed electrician-এর মাধ্যমে wiring করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি IS-standard cable, সঠিক MCB/fuse, earthing এবং exposed joint এড়ানোর নির্দেশ রয়েছে। (AASAN)
বিদ্যুতের তার যেন মানুষের চলাচলের জায়গায় ঝুঁকি তৈরি না করে এবং প্যান্ডেল যেন বিদ্যুতের overhead line-এর খুব কাছে না হয়—সেদিকেও নজর দিতে হবে। (AASAN)
জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং দমকলের প্রবেশের রাস্তা সবসময় খোলা রাখা উচিত।
১১. নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ
বড় পুজোয় স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
প্রবেশ ও প্রস্থান আলাদা রাখা, বয়স্ক ও বিশেষভাবে সক্ষম দর্শনার্থীদের জন্য সহজ পথ তৈরি করা, শিশুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং জরুরি যোগাযোগ নম্বর প্রকাশ করা যেতে পারে।
কলকাতা পুলিশের পুজো সংক্রান্ত গাইড ম্যাপও রয়েছে, যা বড় উৎসবে পথনির্দেশ ও যাতায়াত পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। (Kolkata Police)
ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা পুলিশ পুজো কমিটিগুলিকে Cyber Safe Durga Puja সচেতনতা প্রচারে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। (Kolkata Police)
১২. সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—কিন্তু নিয়ম মেনে
ধুনুচি নাচ, ঢাক, শঙ্খধ্বনি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, আগমনী গান এবং বাংলার লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান পুজোর আবহকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
তবে লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারিত নিয়ম ও অনুমতি মেনে চলতে হবে।
১৩. দশমীর সিঁদুর খেলা ও বিসর্জন
দশমীতে দেবীর বরণ, সিঁদুর খেলা এবং মিষ্টিমুখের পর আসে বিসর্জনের পালা।
বিসর্জনের আগে Immersion Route Chart তৈরি করা এবং প্রশাসনের নির্ধারিত নির্দেশ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। AASAN-এর নথির তালিকাতেও আগের ও বর্তমান বছরের বিসর্জনের route chart-এর উল্লেখ রয়েছে। (AASAN)
বিসর্জনের সময় শোভাযাত্রায় নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল, শব্দ এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
১৪. পুজোর হিসাব স্বচ্ছ রাখুন
সর্বজনীন পুজোর ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের হিসাব পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদা, বিজ্ঞাপন, অনুদান ও অন্যান্য আয় এবং প্যান্ডেল, প্রতিমা, আলো, বিদ্যুৎ, ভোগ, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিসর্জনের খরচের আলাদা হিসাব রাখা উচিত।
AASAN-এর আবেদন প্রক্রিয়াতেও পুজো/উৎসবের বাজেট-সংক্রান্ত নথির উল্লেখ রয়েছে। (AASAN)
শেষ কথা
বাংলার দুর্গাপুজো মানে শুধু বড় প্যান্ডেল বা বড় বাজেট নয়।
এটি হল শাস্ত্রীয় আচার, বাঙালির রান্না, ঢাকের বাদ্যি, আলপনা, শোলা, প্রতিমাশিল্প, সংস্কৃতি এবং মানুষের মিলন।
একটি সুন্দর বাঙালি দুর্গাপুজো আয়োজনের মূলমন্ত্র হতে পারে—
“ঐতিহ্যে শিকড়, আয়োজনে আধুনিকতা, নিরাপত্তায় সতর্কতা এবং উৎসবে সকলের অংশগ্রহণ।”
সরকারি অনুমতি ও নথির নিয়ম জেলা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুজো কমিটির উচিত সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, পুরসভা/নগর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, দমকল ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশিকা অনুসরণ করা। AASAN বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে পুজোর অনুমতির জন্য একক-জানালা অনলাইন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। (AASAN)
অন্তরা ত্রিপাঠী | IBG NEWS BANGLA



















