ভারতে পরকীয়া কি বিবাহবিচ্ছেদের বৈধ কারণ? আদালতে কীভাবে প্রমাণ করতে হয় ব্যভিচার
আকাশ জীবক | IBG NEWS
নয়াদিল্লি: ভারতে পরকীয়া বা ব্যভিচার (Adultery) বর্তমানে আর কোনও ফৌজদারি অপরাধ নয়। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা বাতিল হওয়ার পর ব্যভিচারকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। তবে ফৌজদারি অপরাধ না হলেও বিবাহবিচ্ছেদের মতো পারিবারিক ও দেওয়ানি মামলায় পরকীয়া এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করা যেতে পারে। এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভরণপোষণের দাবির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনি বিধানের ভিত্তিতেই বিচারক সিদ্ধান্ত নেন।
আদালতে পরকীয়া প্রমাণের জন্য কী ধরনের তথ্য গ্রহণযোগ্য?
পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক সাধারণত ব্যক্তিগত পরিসরে গড়ে ওঠে। ফলে প্রত্যক্ষদর্শী বা শারীরিক সম্পর্কের সরাসরি প্রমাণ সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। এই পরিস্থিতিতে আদালত বিভিন্ন পরিস্থিতিগত, নথিভিত্তিক এবং ডিজিটাল প্রমাণ বিবেচনা করতে পারেন।
১. ডিজিটাল প্রমাণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা
হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ফেসবুক মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রামের ব্যক্তিগত বার্তা, ইমেল, অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও কোনও মামলায় প্রাসঙ্গিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এই ধরনের তথ্যের সত্যতা, প্রেক্ষাপট এবং নির্ভরযোগ্যতা আদালতের কাছে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কেবল কিছু বার্তা বা স্ক্রিনশট দেখিয়েই পরকীয়া প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
২. কল রেকর্ড ও অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য
মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR), জিপিএস লোকেশন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য কোনও ব্যক্তির যোগাযোগ বা অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বারবার ফোনে কথা বলা বা একই স্থানে উপস্থিত থাকাই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে এগুলির গুরুত্ব নির্ধারণ করা হয়।
৩. হোটেলের নথি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল
কোনও ব্যক্তির অন্য কারও সঙ্গে হোটেলে অবস্থানের বুকিং রেকর্ড, অতিথি নিবন্ধনের তথ্য, বিল এবং সংশ্লিষ্ট নথি মামলার পরিস্থিতি অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে একই হোটেলে থাকা বা একসঙ্গে ভ্রমণ করার ঘটনা একাই ব্যভিচার প্রমাণ করে না। আদালত সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ও অন্যান্য প্রমাণও বিবেচনা করেন।
৪. সাক্ষীর বয়ান
কোনও নিরপেক্ষ সাক্ষী যদি সংশ্লিষ্ট দু’জনকে এমন পরিস্থিতিতে দেখে থাকেন, যা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, তবে তাঁর সাক্ষ্য মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস, গোপন সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকা সাক্ষীর বক্তব্য আদালত বিবেচনা করতে পারেন।
ডিজিটাল প্রমাণের ক্ষেত্রে কী কী আইনি শর্ত রয়েছে?
আদালতে কোনও তথ্য বা নথি জমা দিলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। প্রমাণের সত্যতা, প্রাসঙ্গিকতা এবং আইন অনুযায়ী তা উপস্থাপনের পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম, ২০২৩ (Bharatiya Sakshya Adhiniyam, 2023)-এর ৬৩ ধারায় ইলেকট্রনিক রেকর্ডের গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ইমেল বা অন্যান্য ডিজিটাল নথি আদালতে দাখিল করার সময় প্রযোজ্য নিয়ম মেনে চলা জরুরি। পুরোনো ভারতীয় সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৬৫বি ধারার পরিবর্তে নতুন আইনে এই বিষয়গুলির জন্য সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোজ্য হয়েছে।
তবে সব পরিস্থিতিতে একই ধরনের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না। ডিজিটাল তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, কোন মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং মামলার প্রকৃতি কী, তার ভিত্তিতে প্রযোজ্য আইনি শর্ত নির্ধারিত হয়।
গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে প্রমাণ সংগ্রহ করা কি বৈধ?
পরকীয়া প্রমাণের জন্য বেআইনিভাবে কারও ফোন হ্যাক করা, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা বা গোপন ক্যামেরা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি তোলা গুরুতর আইনি ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
কোনও প্রমাণ কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা তার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রমাণমূল্য নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে বেআইনিভাবে সংগৃহীত কোনও প্রমাণ সব ক্ষেত্রেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়, এমন কোনও সর্বজনীন নিয়ম নেই। আদালত মামলার প্রকৃতি, প্রযোজ্য আইন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের বিষয়গুলি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ বা ব্যক্তিগত নথি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশ নেওয়া উচিত।
শুধুমাত্র প্রেমের বার্তাই কি পরকীয়া প্রমাণের জন্য যথেষ্ট?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেমের বার্তা আদান-প্রদান, ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব বা ব্যক্তিগত কথোপকথন সব সময় ব্যভিচারের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। আদালত সাধারণত সম্পর্কের সামগ্রিক পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ এবং অন্যান্য বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন।
শুধুমাত্র কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলা বা নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ভিত্তিতে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। পরিস্থিতিগত প্রমাণের ধারাবাহিকতা এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
পরকীয়া প্রমাণিত হলে কি বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়া যায়?
হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ (Hindu Marriage Act, 1955)-এর ১৩(১)(i) ধারা অনুযায়ী, বিবাহের পর স্বামী বা স্ত্রী অন্য কারও সঙ্গে স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা বিবাহবিচ্ছেদের একটি আইনি ভিত্তি হতে পারে। অন্যান্য ব্যক্তিগত আইনেও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করা সম্ভব।
তবে পরকীয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি দেওয়া হয় না। আদালত সংশ্লিষ্ট আইনের শর্ত, দাখিল করা প্রমাণ এবং মামলার অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে রায় দেন।
ভরণপোষণের ক্ষেত্রেও কি পরকীয়ার প্রভাব পড়ে?
পরকীয়া প্রমাণিত হলে নির্দিষ্ট আইনি বিধানের অধীনে ভরণপোষণের দাবির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু বিবাহ আইনের ২৫(৩) ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থায়ী ভরণপোষণের আদেশ পরিবর্তন, সংশোধন বা বাতিল করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। একইভাবে, ফৌজদারি কার্যবিধির পরিবর্তে বর্তমানে প্রযোজ্য ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর ১৪৪ ধারায় ভরণপোষণ সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, যেখানে স্ত্রী ব্যভিচারে লিপ্ত থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে ভরণপোষণের অধিকার প্রভাবিত হতে পারে।
তবে প্রতিটি মামলায় একই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন, মামলার পরিস্থিতি এবং আদালতের আদেশের ওপর ভরণপোষণের বিষয়টি নির্ভর করে।
আইনি লড়াইয়ে প্রমাণের গুরুত্ব
ভারতে পরকীয়া আর ফৌজদারি অপরাধ না হলেও পারিবারিক আইনে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ বা ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলায় অভিযোগের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য, প্রাসঙ্গিক এবং আইন অনুযায়ী উপস্থাপিত প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের পরামর্শ অনুযায়ী, এ ধরনের মামলায় কোনও প্রমাণ সংগ্রহ বা আদালতে দাখিল করার আগে আইনি পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান—সবকিছুই মামলার চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
আকাশ জীবক
IBG NEWS
আইন, সমাজ ও সমসাময়িক বিষয়ের সংবাদ বিশ্লেষণ
আইনি সতর্কতা যোগ করে প্রকাশযোগ্য করুন শুরুর সারাংশ আরও সহজ করুন| Consult your legal team before any step.

















