
এক মঞ্চে বনেদিয়ানা, বিপ্লবী ইতিহাস ও বাঙালির সংস্কৃতি: ‘দেবীপক্ষে বাঙালিয়ানা’ নিয়ে ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়ের একান্ত কথন
চোরবাগান শীলবাড়ির ঠাকুরদালানে ‘বনেদি ও বিপ্লবী সম্মেলন’-এর পঞ্চম বর্ষে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনন্য মেলবন্ধন
বিশেষ সাক্ষাৎকার | সুমন মুন্সি, IBG NEWS
কলকাতা: বনেদি পরিবারের ঐতিহ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরাধিকার, মহাপুরুষদের স্মৃতি এবং বাংলার শিল্প-সংস্কৃতিকে একই সূত্রে গাঁথার এক বিশেষ প্রয়াস—‘দেবীপক্ষে বাঙালিয়ানা’। চোরবাগান শীলবাড়ির ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরদালানে ‘বনেদি ও বিপ্লবী সম্মেলন’-এর পঞ্চম বর্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে আবেগ, গর্ব ও স্মৃতিচারণে একাকার হয়ে ওঠে সন্ধ্যা।
এই আয়োজনের ভাবনা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে IBG NEWS-এর সঙ্গে কথা বলেছেন ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, এই সন্ধ্যা ছিল শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়; বরং বাংলার ইতিহাস, বনেদি ঐতিহ্য, বিপ্লবী চেতনা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে এক মঞ্চে মিলিয়ে দেওয়ার স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
“ইতিহাস তৈরি করতে হয়, আর বাঙালিই পারে”
প্রশ্ন: ‘দেবীপক্ষে বাঙালিয়ানা’—এই উদ্যোগের মূল ভাবনা কী?
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: ইতিহাস তৈরি করতে হয়। শুধুমাত্র বাঙালিই পারে—এই বিশ্বাস থেকেই আমার স্বপ্নের নিবেদন ‘দেবীপক্ষে বাঙালিয়ানা’। বনেদি পরিবার, বিপ্লবী, মহাপুরুষ এবং গুণী বাঙালিদের এক সূত্রে গেঁথে রাখার ইচ্ছা ছিল বহুদিনের।
আজ চোরবাগান শীলবাড়ির ঠাকুরদালানে সেই স্বপ্নের একটি সুন্দর রূপ দেখতে পেলাম। আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, যাঁদের ইতিহাস ও অবদান আমাদের গর্বিত করে, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা পাশাপাশি এসে বসলেন। এই মিলনটাই আমি চেয়েছিলাম।
ইতিহাসের উত্তরসূরিদের এক মঞ্চে মিলন
প্রশ্ন: অনুষ্ঠানের কোন মুহূর্তটি আপনার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে?
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: মাস্টারদা সূর্য সেনের নাতি, বিপ্লবী বাদল গুপ্তের পরিবারের সদস্য এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বংশধরদের একসঙ্গে দেখতে পাওয়া আমার কাছে অত্যন্ত আবেগের বিষয়।
আমরা প্রায়ই ইতিহাসের কথা বলি, বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করি, মহাপুরুষদের অবদান নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু তাঁদের পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসিয়ে তাঁদের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানোর মধ্যে আলাদা একটা অনুভূতি রয়েছে। আজ সেই অনুভূতিটাই বাস্তব হয়ে উঠল।
বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যে বাংলার শিকড়
প্রশ্ন: বাংলার বনেদি পরিবারগুলির উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে কীভাবে সমৃদ্ধ করেছে?
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: বাংলার বনেদি বাড়িগুলি আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ধারক। শোভাবাজার রাজবাড়ি, জানবাজারের রানী রাসমণির পরিবার, ঠনঠনিয়া দত্তবাড়ি, উত্তরপাড়া রাজবাড়ি এবং চিৎপুরের মল্লিক পরিবারের ঐতিহ্য—প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার গৌরবময় অতীতের নানা অধ্যায়।
এই পরিবারগুলির উপস্থিতি এবং তাঁদের ঐতিহ্যবাহী স্মারক ও ছবির মাধ্যমে আমরা সেই ইতিহাসকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছি। আমি চেয়েছিলাম, বনেদিয়ানা যেন শুধু পুরোনো বাড়ি বা পারিবারিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তা বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রতীক হয়ে উঠুক।
চিঠি, বই ও স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন
প্রশ্ন: অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক বই, চিঠি এবং পুরোনো রেডিওর মতো নিদর্শনও বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। এই বিষয়টি নিয়ে কী বলবেন?
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: আজকের সন্ধ্যায় এমন কিছু স্মৃতিবিজড়িত উপাদান সামনে এসেছে, যেগুলি ইতিহাসকে যেন আরও কাছের করে দিয়েছে। ভাষা শহিদ কমলার ভাইঝির লেখা বই আমার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও বিধানচন্দ্র রায়ের চিঠিও হাতে পাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
কুমারটুলির অমিতবাবুর রেডিও-সহ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলিও ছিল আকর্ষণের কেন্দ্র। এগুলি শুধুমাত্র সংগ্রহযোগ্য বস্তু নয়; এগুলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সময়, মানুষ, স্মৃতি এবং ইতিহাসের স্পর্শ।
আমার মনে হয়, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই স্মৃতিগুলিকে পৌঁছে দেওয়া খুব জরুরি। ইতিহাসকে শুধু বইয়ের পাতায় আটকে রাখলে হবে না, তাকে অনুভব করার সুযোগও তৈরি করতে হবে।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মঞ্চ
প্রশ্ন: অনুষ্ঠানটির সাংস্কৃতিক পর্বে বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনা ছিল। এই অংশটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: বাংলার ঐতিহ্য শুধু অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরাও সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। তাই এই অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিকার, সংগীতশিল্পী এবং অন্যান্য গুণী মানুষের পরিবেশনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তালবাদ্যে গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সুযোগ্য পুত্রের পরিবেশনা, হিমাদ্রি ও ঐতিহ্যের আগমনী গান, হৃষভের স্তোত্রপাঠ, শাশ্বতী ও অন্নপূর্ণা বাড়ির নৃত্য এবং শুভদীপের আবৃত্তি—সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি অন্য মাত্রা পেয়েছিল।
মডেল শর্মিষ্ঠা ও ডা. কৌশিক লাহিড়ীর বক্তব্যও অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে। আমার কাছে এই অংশের গুরুত্ব হল, এখানে ইতিহাসের উত্তরাধিকার এবং বর্তমান প্রজন্মের প্রতিভা পাশাপাশি স্থান পেয়েছে।
স্মৃতিচারণ, আড্ডা ও ঠাকুরবাড়ির আবহ
প্রশ্ন: অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পর্বের বাইরেও বেশ কিছু আন্তরিক মুহূর্ত ছিল।
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: অবশ্যই। প্রয়াত মালিক গৌতম নট্টের স্মৃতিচারণ ছিল আবেগঘন একটি পর্ব। মানুষ চলে গেলেও তাঁর স্মৃতি ও অবদান থেকে যায়—এই অনুভূতিই যেন সেখানে ফিরে এসেছিল।
এর পাশাপাশি ঠাকুরদালানে চা-আড্ডা, ফটোশুট, সুবোধের মিষ্টি ও নোনতা খাবার এবং ঠাকুরবাড়িতে মায়ের আরতি—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি একটি পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলার রূপ পেয়েছিল।
আমি চাইনি এটি কেবল মঞ্চ, বক্তৃতা ও পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। মানুষ যেন পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, স্মৃতি ভাগ করে নিতে পারেন এবং বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হতে পারেন—সেই আবহ তৈরি হওয়াটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
“কিছু অনুষ্ঠান লিখে বোঝানো যায় না”
প্রশ্ন: পঞ্চম বর্ষের এই আয়োজন থেকে আপনার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী?
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: আমার স্বপ্ন ছিল বনেদি, বিপ্লবী, মহাপুরুষ এবং গুণী বাঙালিদের এক সূত্রে গেঁথে রাখা। আজ সেই স্বপ্নের একটি সুন্দর বাস্তবায়ন দেখলাম।
বাঙালি এর আগে এমন অনুষ্ঠান দেখেছে কি না, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে আমার কাছে এই সন্ধ্যা ছিল একেবারেই বিশেষ। এতগুলি পরিবার, এতগুলি ইতিহাসের ধারা, এত প্রতিভাবান শিল্পী এবং এত স্মৃতিবিজড়িত উপাদানকে একই জায়গায় নিয়ে আসা—এটি আমার কাছে গভীর আনন্দের।
কিছু অনুষ্ঠান লিখে বোঝানো যায় না। সেগুলি শুধু চাক্ষুষ করা যায়, অনুভব করা যায় এবং মনের মধ্যে বেঁধে রাখা যায়। ‘দেবীপক্ষে বাঙালিয়ানা’ ছিল তেমনই এক সন্ধ্যা।
এখন শুধু অপেক্ষা—এর পরে আবার কবে, কখন এমন একটি সন্ধ্যা ফিরে আসবে।
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের হাতে
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে এই উদ্যোগকে কোন পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান?
ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়: আমার কাছে এই উদ্যোগের মূল কথা হল সংযোগ তৈরি করা—অতীতের সঙ্গে বর্তমানের, বনেদি ঐতিহ্যের সঙ্গে বিপ্লবী ইতিহাসের, আর প্রবীণ প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতার।
বাংলার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প এবং মনীষীদের স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। ‘দেবীপক্ষে বাঙালিয়ানা’ সেই ভাবনারই একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।
আমি চাই, এই সন্ধ্যার স্মৃতি আমাদের মনে থাকুক এবং ভবিষ্যতে আবারও এমন মিলনের সুযোগ তৈরি হোক।
IBG NEWS-এর পর্যবেক্ষণ
চোরবাগান শীলবাড়ির ঠাকুরদালানে ‘দেবীপক্ষে বাঙালিয়ানা’ বাংলার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, বনেদি পরিবারের ঐতিহ্য এবং সমকালীন সাংস্কৃতিক প্রতিভাকে এক মঞ্চে আনার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। ড. পার্থসারথি মুখোপাধ্যায়ের বর্ণনায়, এই আয়োজনের সার্থকতা শুধু একটি সফল সন্ধ্যায় নয়, বরং বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিচ্ছিন্ন ধারাগুলিকে পারস্পরিক সংযোগে নিয়ে আসার প্রচেষ্টায়।
সুমন মুন্সি | IBG NEWS


















