মনিপুরের যুদ্ধ যে মূলত মাদক যুদ্ধ সেটা বোঝা আগে দরকার
অমিত গোস্বামী
‘যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা’ – বাংলা প্রবাদ, বাঙালি প্রবাদ। মনিপুর নিয়ে আমাদের মনোভাব কিছুটা সেরকম। প্রচুর আলোচনা হচ্ছে, প্রচুর তথ্য, প্রচুর ইতিহাস, প্রচুর ভাষন ভাসছে। কিন্তু আসল কথা কেউ বলছে না। সেটা হল লড়াই মূলত মাদক কারবারীদের সাথে মাদক বিরোধীদের। দুই কুকি রমনীকে নগ্ন করে প্রকাশ্যে ঘোরানোর তীব্র নিন্দা করে বাস্তবের দিকে মুখ ফেরানো যাক। গত ৩ মে জনজাতি ছাত্র সংগঠন ‘অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ মণিপুর’ (এটিএসইউএম)-এর কর্মসূচি ঘিরে মণিপুরে অশান্তির সূত্রপাত। মণিপুর হাই কোর্ট মেইতেইদের তফসিলি জনজাতির মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারকে বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছিল। এর পরেই জনজাতি সংগঠনগুলি তার বিরোধিতায় পথে নামে। আর সেই ঘটনা থেকেই সংঘাতের সূচনা হয় সেখানে। মণিপুরের আদি বাসিন্দা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কুকি, জ়ো-সহ কয়েকটি তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের (যাদের অধিকাংশই খ্রিস্টান) সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত প্রায় দু’শো জনের মৃত্যু হয়েছে। ঘরছাড়ার সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। এগুলি আমরা সবাই জানি। কিন্তু হাইকোর্টের রাজ্য সরকারকে মেইতেইদের জনজাতির মর্যাদা দেওয়ার পরামর্শে কুকি, জ়ো-সহ কয়েকটি তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের এতটাই গাত্রদাহ হল যে জাতিদাঙ্গা শুরু হল কেন? অদৃশ্য হাত কাদের? কারণ কি কি?
কুকি-জো’রা নিজেদের মিয়ানামারের মানুষদের মনে করে নিজেদের মানুষ। কুকি ন্যাশনাল আর্মি, কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট, ইউনাইটেড কুকি লিবারেশন ফ্রন্ট-সহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী মিয়ানামারের প্রশ্রয়ে ও আশ্রয়ে বেশ পুষ্ট। সেখানে চিনা গুপ্তচর সংস্থা ধারাবাহিক ভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিদের অস্ত্র এবং পরিকাঠামোগত সহায়তা করে বলে অভিযোগ। নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিয়ানামারের প্রায় ৯ লক্ষ হেক্টর জমিকে বলা হয় ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’। এখানে আফিং চাষ হয়। মনিপুরের ১ লক্ষ ২৫ হাজার হেক্টর কুকি অধ্যুসিত জমিতে আফিং চাষ হয় বলে জানা যায়। মনিপুরে এই মাদক পাচারের অঙ্ক বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বলে শোনা যায়। ভারতে ও বাংলাদেশে এই মাদক পাচার হয়। এই দুই দেশে মাদক নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার আসার পরে তাদের সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসৃত হয়। প্রচুর উত্তর পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিদের বাংলাদেশ থেকে ঠেলে পাঠানো হয় ভারতে। তাতে উত্তর পূর্বাঞ্চলের জঙ্গি উপদ্রব অনেক কমে আসে। সামরিক বাহিনীর অবস্থানের সংখ্যাও কমে যায়। কিন্তু এই মাদক কারবারীরা আশঙ্কিত হয় যখন মনিপুর হাইকোর্ট তাদের পরামর্শ মনিপুর সরকারকে জানায়। মেইতেইরা বৈষ্ণব এবং মাদক বিরোধী। মেইতেইরা এখন জনজাতিদের নির্দিষ্ট জমি কিনতে পারে না। কিন্তু তারা জনজাতির মর্যাদা পেলে জনজাতিদের নির্দিষ্ট জমি যা কুকি-জো’দের এখন কুক্ষিগত সেগুলি কিনতে পারবে এবং আফিং চাষ বন্ধ করে দেবে। এই আশঙ্কায় সংঘাতের সূত্রপাত।
পুলিশ বা সামরিক বাহিনী দিয়ে এই দাঙ্গা থামানো মুশকিল। আজ অবুঝ ব্যবহার করে সংসদ অচল করে সাধারন মানুষের অর্থের অপচয় করছে রাজনৈতিক দলগুলি। সমস্যা বুঝে একসাথে এই সমস্যার সমাধানে তাদের এগিয়ে আসা উচিৎ।

লেখক সম্পর্কিত তথ্য: অমিত গোস্বামী প্রখ্যাত কবি, লেখক, সম্পাদক ও সমাজকর্মী। ভারত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ভ্রাতৃত্বের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ। মঞ্চে এবং সিনেমায়ও সম্মানিত মুখ।
**This article was published under the freedom of expression and academic analysis of geo-political international relationships in the southeast Asia Pacific region. The opinion was expressed by the author on his Facebook wall and published here with his permission. IBG NEWS neither agrees nor disagrees with the opinion.



















