উদার আকাশ সাহিত্য সংস্কৃতির সেবায় অনন্য
লালমিয়া মোল্লা
‘‘উদার আকাশ প্রকাশন গত বেশ কিছু বছর ধরে কলকাতা বইমেলায় নিজের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছে।’’ ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে এমনই এক দাবি করা হয়েছে। না, এটা কোনও অতিশয়োক্তি নয়। এই পত্রিকাটি ২৩ বছর ধরে একটানা সগৌরবে প্রকাশিত হচ্ছে। এখন এটি একটি পিয়ার রিভিউড ষাণ্মাসিক দ্বি-ভাষিক রিসার্চ জার্নাল।
এই পত্রিকা এবছর থেকে সৃজনশীল লেখকদের জন্য ‘উদার আকাশ’ পুরস্কার চালু করল। সুদৃশ্য মানপত্র ও স্মারক-সহ নগদ পুরস্কার মূল্য এক লাখ এক টাকা। এ বছর এই ‘উদার আকাশ আল্লামা ড. মুহাম্মদ ইকবাল স্মৃতি পুরস্কার’ পেলেন মহিউদ্দিন সরকার তাঁর লেখা ‘ইসলামের পরিচয়’ গ্রন্থের জন্য। এই মুহূর্তে সাহিত্য পত্রিকার জগতে উদার আকাশ একটি মাইল ফলক। উদার আকাশ কেবল পত্রিকা নয়, আত্মমর্যাদার অভিজ্ঞান।
উদার আকাশ-এর ২৩তম বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি ৪৭তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ১৪৩০ সংখ্যা। প্রতিটি সংখ্যার মতো এই সংখ্যাটিও একগুচ্ছ সুচিন্তিত মননশীল প্রবন্ধ নিয়ে পাঠকের দরবারে হাজির হয়েছে। অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের ১৫০তম জন্মবর্ষপূর্তির কথা মনে রেখে তিনজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদের লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে যা পাঠককে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করবে। এগুলি লিখেছেন ড. মইনুল হাসান, মোশারফ হোসেন ও ড. কুমারেশ চক্রবর্তী। এছাড়া ভারতীয় সংগীত-সংস্কৃতিতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সাধনা বিষয়ে লিখেছেন জয়ন্ত ঘোষাল। ইসলাম চর্চায় শয়তানের শয়তানি চেনার উপায় নিয়ে লিখেছেন মহিউদ্দিন সরকার। শিক্ষা চিন্তায় অগ্রণী শিল্পপতি মোস্তাক হোসেনকে দ্বিতীয় মহসীন আখ্যা দিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন দেবাশিস পাঠক। এই বিষয়ে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে এক অদম্য সিপাহসালার নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন গোলাম রাশিদ। অনুকরণীয় আদর্শের অভাবে বিপথগামী ছাত্র ও যুবসমাজ নিয়ে লিখেছেন মহম্মদ মফিজুল ইসলাম।
এই মুহূর্তে গণতান্ত্রিক ভারতের সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় ধর্মান্ধতা, যা দেশকে এক অন্ধকার যুগের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। মহামতি হাফিজের কবিতার অনুষঙ্গ ছুঁয়ে গ্যোয়েটে লিখেছিলেন West Ostlicher Divan, আসলে যা সমস্তরকম ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে নান্দনিক এক প্রতিবাদ। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত যে কাব্যগ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন ‘প্রাচী-প্রতীচীর মিলনবেলার পুঁথি’ শিরোনামে। বর্তমান ধর্মান্ধ রাষ্ট্রনায়কদের ভূমিকা স্মরণ করে ড. মুহম্মদ মতিউল্লাহ্ লিখেছেন অসাধারণ একটি প্রবন্ধ ‘হাফিজ গ্যোয়েটে এবং অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত’।
এছাড়াও প্রান্তিক সংবাদ চর্চা, নজরুল চর্চা, সমাজ, চলচ্চিত্র, নাটক, বিশ্বসাহিত্য, লোকসাহিত্য, স্বাস্থ্যভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধগুলি লিখেছেন সমীর ঘোষ, ড. মহঃ আসিফ ইকবাল, রণজয় মালাকার, কাজী খায়রুল আনাম, হাফিজুর রহমান, সুমন ভট্টাচার্য, মধুবন চক্রবর্তী, চৈতি চক্রবর্তী, ড. সৌমিতা মিত্র, রফিক আনোয়ার, ড. শামিম আহমেদ প্রমুখ।
পাঁচটি গল্প লিখেছেন এই সময়ের পাঁচজন গল্পকার অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মিলনকান্তি বিশ্বাস, মোর্তজা খন্দকার, শাহনাওয়াজ বিশ্বাস, সোনিয়া তাসনিম। এছাড়া ‘কাল্পনিক সংলাপ’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন আকমাম খান। গৌতম সমাজদার লিখেছেন একটি অনুগল্প। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ খাজিম আহমেদ-এর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজন গঙ্গোপাধ্যায়।
উদার আকাশ তার জন্মলগ্ন থেকেই নতুন লেখকদের জন্য উদার। আজকের অনেক পরিচিত লেখকের প্রথম দিকের লেখা উদার আকাশে ছাপা হয়েছে। উদার আকাশ-এর প্রতিটি সংখ্যাতে বিখ্যাতদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত নবীনদের লেখা গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়। এই সংখ্যাতেও সগৌরবে ৭৩ জন কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন আশিস সান্যাল, প্রবীর ঘোষ রায়, অজিত বাইরী, দেবাশিস সাহা, সুব্রতা ঘোষ রায়, হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়, রোকেয়া ইসলাম, সৌমিত্র মজুমদার, সোহেল রানা, ইলা দাস, সালেহা খাতুন, লিটন রাকিব, শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ, এস হজরত আলি, জাহাঙ্গীর মিদ্দে, জুলেখা সুলতানা, ফারুক আহমেদ, রাকা মাইতি প্রমুখ। প্যালেস্তাইন বিষয়ক একগুচ্ছ কবিতা লিখেছেন কবি তমাল সাহা। এছাড়া সদ্য প্রয়াত কবি আবদুর রব খানের লেখা একগুচ্ছ ছড়া প্রকাশিত হয়েছে।
পাঠকের কলমে দুটি মনোজ্ঞ চিঠি লিখেছেন মহঃ হাফিজ ও সাবিহা তাসনীম আফিয়া। চমৎকার কাগজে ঝকঝকে ছাপা এই পত্রিকাটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন ড. রীতেন্দ্র রায়। সূচিপত্রের ছবি প্রখ্যাত শিল্পী সারফুদ্দিন আহমেদ। প্রতিটি সংখ্যার মতো এ সংখ্যাটিও ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য।













