ঐতিহ্য ও ইতিহাসের হাতছানি: মহাসপ্তমীতে ধান্যকুড়িয়ার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় এক নস্টালজিক সফর
গায়েন বাড়ি থেকে বল্লভ বাড়ি—প্রাসাদোপম স্থাপত্য, প্রাচীন ঠাকুরদালান ও পারিবারিক ঐতিহ্যের আবহে উত্তর ২৪ পরগনার ধান্যকুড়িয়ায় দুর্গাপুজোর এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
কলমে: ডাঃ ধীরেশ চৌধুরী
বিজয়া দশমী, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কলকাতার চেনা পুজোমণ্ডপ, আলোর রোশনাই আর জনসমুদ্রের বাইরে এবারের দুর্গাপুজোয় একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিলাম। পরিকল্পনাটি মূলত কুহুর। ইচ্ছে ছিল, উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করা, পুরোনো স্থাপত্যের সামনে কিছুটা সময় কাটানো এবং ব্যস্ত শহরের বাইরে নিজেদের মতো করে একটি দিন উপভোগ করা। সেই ভাবনা থেকেই মহাসপ্তমীর গন্তব্য হয়ে উঠল উত্তর ২৪ পরগনার ঐতিহ্যবাহী জনপদ ধান্যকুড়িয়া।
ধান্যকুড়িয়া: অতীতের ঐশ্বর্যের জীবন্ত স্মারক
একসময় জমিদার ও সম্পন্ন ব্যবসায়ী পরিবারগুলির সমৃদ্ধির জন্য পরিচিত ছিল ধান্যকুড়িয়া। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে গড়ে ওঠা এখানকার প্রাসাদোপম বাড়িগুলিতে আজও অতীতের ঐশ্বর্য, স্থাপত্যের বৈচিত্র্য এবং বনেদি সংস্কৃতির পরিচয় মেলে।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। পুরোনো দিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আর আগের মতো নেই। তবু কিছু বাড়ি, তাদের ঠাকুরদালান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দুর্গাপুজো অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি নিবিড় যোগসূত্র তৈরি করে রেখেছে।
এই বাড়িগুলির সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, আমরা শুধু পুজো দেখতে আসিনি; বরং ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ের কাছে এসে পৌঁছেছি, যেখানে প্রতিটি দেওয়াল, প্রতিটি স্তম্ভ এবং প্রতিটি অলংকরণ যেন অতীতের গল্প বলে।
কলকাতা থেকে ধান্যকুড়িয়া: পথেই পুজোর আবহ
কলকাতা থেকে গাড়িতে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ পেরিয়ে আমাদের যাত্রা। রাস্তায় বেরিয়েই শুরু হয়ে গেল পুজো দেখা। পথে একের পর এক মণ্ডপ, মানুষের উৎসাহ এবং উৎসবের সাজে সজ্জিত জনপদ—সব মিলিয়ে যাত্রাটিও হয়ে উঠল পুজোর আনন্দের অংশ।
কলকাতার মতো বিপুল জাঁকজমক না থাকলেও ছোট শহর ও পথের ধারের পুজোগুলিতে আন্তরিকতার কোনও অভাব চোখে পড়েনি। কোথাও আলো, কোথাও প্রতিমা দর্শনের ভিড়, আবার কোথাও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উৎসব উপভোগ করার সহজ-সরল ছবি।
প্রায় দ্বিপ্রহরে বসিরহাটের কাছাকাছি পৌঁছে ধান্যকুড়িয়ার বনেদি বাড়িগুলির পুজোয় হাজির হলাম। দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল যথেষ্ট, তবে কলকাতার তুলনায় অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। ফলে তাড়াহুড়ো না করে বাড়িগুলির স্থাপত্য ও পুজোর পরিবেশ উপভোগ করার সুযোগ মিলল।
আমাদের প্রথম গন্তব্য গায়েন বাড়ি, তার পরে বল্লভ বাড়ি।
গায়েন বাড়ি ও বল্লভ বাড়ি: ঠাকুরদালানে ইতিহাসের ছোঁয়া
বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো দেখার ইচ্ছে বহুদিনের। আধুনিক পুজোর থিম, আলোকসজ্জা ও বৃহৎ আয়োজনের নিজস্ব আকর্ষণ রয়েছে। কিন্তু পুরোনো জমিদারবাড়ির পুজোর অনুভূতি একেবারেই আলাদা।
প্রাসাদোপম বাড়ি, পুরোনো দেওয়াল, অলংকৃত স্থাপত্য এবং ঠাকুরদালানের নিজস্ব পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সময় যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়েছে। এই বাড়িগুলি কত প্রজন্মের সুখ-দুঃখের সাক্ষী! কত মানুষ এখানে এসেছেন, কত মানুষ সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছেন, কত সামাজিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে—অথচ দেবী আরাধনার ঐতিহ্য আজও কোনও না কোনওভাবে বহমান।
বনেদি বাড়ির পুজো তাই কেবল প্রতিমা দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক ইতিহাস, সামাজিক উত্তরাধিকার এবং শিকড়ের প্রতি এক গভীর টান।
প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে যেমন ভক্তির অনুভূতি জাগে, তেমনই পুরোনো বাড়ির স্থাপত্য ও পরিবেশ আমাদের অতীতের কথা ভাবতে শেখায়। বর্তমানের উৎসবের আনন্দের সঙ্গে সেখানে মিশে থাকে স্মৃতি, নস্টালজিয়া এবং সময়ের পরিবর্তনকে উপলব্ধি করার এক নীরব অনুভব।
সাউ বাড়ি যাওয়া হল না, থেকে গেল সামান্য আক্ষেপ
আমাদের পরিকল্পনায় সাউ বাড়ির পুজোও ছিল। কিন্তু স্থানীয়ভাবে জানতে পারলাম, এবারে সেখানে পুজো হয়নি। ফলে সেই বাড়িটি দেখা আর হয়ে উঠল না।
কোনও জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে বেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সেখানে পৌঁছতে না পারার মধ্যে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। আমাদেরও কিছুটা আক্ষেপ হল।
তবে ভ্রমণের আনন্দ বোধহয় শুধু পরিকল্পনা সফল হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনও কিছু প্রাপ্তি, কখনও কিছু অপ্রাপ্তি—সব মিলিয়েই একটি ভ্রমণ স্মরণীয় হয়ে ওঠে। ধান্যকুড়িয়ার এই সফরেও সেই অভিজ্ঞতা রয়ে গেল।
টাকি যাওয়ার পথে দুপুরের আহার ও কিছুটা বিশ্রাম
বনেদি বাড়ির পুজো দেখা শেষ করে আমরা টাকির কাছাকাছি ‘সোনা’ নামে একটি বড় রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গেলাম। রেস্তোরাঁটির বসার ব্যবস্থা প্রশস্ত, পরিষেবাও ভালো বলে মনে হয়েছে। খাবারের দামও সাধ্যের মধ্যে থাকায় দীর্ঘ পথ চলার পরে সেখানে স্বস্তিতে কিছুটা সময় কাটানো গেল।
এরপর একটি হোটেলে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম। সারাদিনের ঘোরাঘুরির পরে শরীরকে একটু বিশ্রাম দেওয়া এবং ক্লান্তি কাটিয়ে সন্ধ্যায় আবার কলকাতার পথে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি—ভ্রমণের এই সাধারণ মুহূর্তগুলিও অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে রইল।
উৎসবের আনন্দের মাঝেও মনখারাপ
সারাদিনের ঘোরাঘুরির মধ্যে আনন্দ ছিল, নতুন জায়গা দেখার তৃপ্তি ছিল, ইতিহাসের কাছাকাছি পৌঁছনোর অনুভূতিও ছিল। তবু মনের মধ্যে কোথাও একটা বিষণ্ণতা রয়ে গিয়েছিল।
আগের দিন কলকাতায় ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছিল। চারদিকে উৎসবের আলো, মানুষের উচ্ছ্বাস এবং আনন্দের পরিবেশ থাকলেও মন পুরোপুরি সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে যেতে পারছিল না।
জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা আমাদের স্বাভাবিক অনুভূতিকেও বদলে দেয়। বাইরে থেকে আমরা হয়তো ঘুরে বেড়াই, ছবি তুলি, কথা বলি, হাসিও; কিন্তু মনের একটি অংশ বারবার ফিরে যায় সেই বেদনাদায়ক ঘটনার কাছে।
এই সফরেও সেই অনুভূতি ছিল। আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল এক অদৃশ্য বিষাদ, যা দিনের শেষে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
সময় বদলায়, ঐতিহ্য থেকে যায়
ধান্যকুড়িয়ার পুরোনো বাড়িগুলির দিকে তাকিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল, যাঁরা একসময় এই প্রাসাদোপম বাড়িগুলি তৈরি করেছিলেন এবং দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ ইতিহাসের অংশ। তাঁদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা এবং জীবনের অসংখ্য স্মৃতি সময়ের স্রোতে কোথাও মিলিয়ে গিয়েছে।
কিন্তু বাড়িগুলি রয়ে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে কিছু পারিবারিক স্মৃতি এবং দেবী আরাধনার ধারাবাহিকতা।
সময় যেমন অনেক কিছু কেড়ে নেয়, তেমনই কিছু চিহ্ন রেখে যায়, যার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের অতীতকে চিনতে পারে। এই বাড়িগুলির বর্তমান উত্তরসূরিদের কাছে সেই ঐতিহ্য নিশ্চয়ই গর্বের বিষয়। কারণ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ধরে রাখা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বৃহত্তর ইতিহাসের প্রতিও এক ধরনের অবদান।
ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ কেবল পুরোনো বাড়ি সংরক্ষণ করা নয়; সেই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতি, স্মৃতি, উৎসব এবং মানুষের সম্পর্কগুলিকেও গুরুত্ব দেওয়া।
এক দিনের ভ্রমণ, অনেক স্মৃতি
সন্ধ্যায় কলকাতায় ফিরে মনে হল, ধান্যকুড়িয়ার এই সফর কেবল কয়েকটি পুজো দেখা কিংবা শহরের বাইরে একটি দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রইল ইতিহাসের প্রতি ভালো লাগা, নতুন কিছু দেখার আনন্দ, সাউ বাড়ি যেতে না পারার সামান্য আক্ষেপ এবং আগের দিনের মর্মান্তিক ঘটনার কারণে থেকে যাওয়া মনখারাপ।
সব ভ্রমণ যে উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, তা নয়। কোনও কোনও ভ্রমণ আমাদের শান্ত করে, কিছু স্মৃতি জমা করে এবং নতুন করে ভাবতে শেখায়। কিছু অভিজ্ঞতা সঙ্গে সঙ্গে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না; সময়ের সঙ্গে সেগুলির অর্থ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ধান্যকুড়িয়ার এই মহাসপ্তমীর সফর আমার কাছে তেমনই একটি অভিজ্ঞতা—যেখানে দুর্গাপুজোর আনন্দের পাশাপাশি ছিল ইতিহাসের স্পর্শ, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং এক টুকরো নস্টালজিয়া।
ছবিতে ধরা পড়েছে ধান্যকুড়িয়ার বনেদি বাড়ি, দুর্গাপ্রতিমা এবং পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত। ছবিগুলি ক্যামেরাবন্দি করেছেন ময়ূখ চৌধুরী (Mayukh Chowdhury); কয়েকটি ছবিতে সঙ্গ দিয়েছে তথাও।
ডাঃ ধীরেশ চৌধুরী
বিজয়া দশমী, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ



















