বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে…
অশোক মজুমদার
আনন্দবাজারে প্রায় তিন বছর হল কাজে ঢুকেছি। এটা নব্বইএর দশকের গোড়ার দিকের ঘটনা। একদিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখি টেলিগ্রাফের চিফ ফটোগ্রাফার অলকদা একটা ছবি নিয়ে যা ইচ্ছা বলে যাচ্ছেন। ঘরে অনেকের সঙ্গে রয়েছেন, তারাপদ ব্যানার্জি, তপন দাস, দেবীপ্রসাদ সিংহ সহ কিছু সহকর্মীরা। আমাকে দেখেই অলকদার চিৎকার এই যে দাড়ি (আমায় দাড়ি খোকা নামে ডাকতেন) তোমার বন্ধু কীসব ছবি তুলছে! যা ইচ্ছা তুললেই কি ছবি হয়? টেবিলে রাখা স্টেটসম্যান কাগজের ছবিটাতে দেখলাম – একটা ট্রাম যাচ্ছে, রাস্তায় একটা ছোট ছেলে পিচকিরিটা পেছনে লুকিয়ে দুহাত দিয়ে ধরে রেখেছে। ছবিটা দেখেই মনে হচ্ছে জানলায় বসা লোকেদের পিচকিরি দিয়ে রঙ দেবে। দোলের আগের দিন প্রকাশিত এই ছবিটিতে দোলের আগমন বার্তা ও শিশুর নির্দোষ দুষ্টুমি একসঙ্গে মিশে একটা চমৎকার মুহূর্ত রচনা করেছে। দেখার চোখ ও টাইমিং নিখুঁত না হলে এ ছবি তোলা যায় না।
আমি প্রথমেই বললাম, অলকদা ছবিটায় কোন মেরিট না থাকলে আমরা আলোচনা করছি কেন? আর স্টেটসম্যান ছবিটা ছাপলোই বা কেন? এ নিয়ে আমাদের ভেতর একটু তর্কাতর্কি হল। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, অলকদা বলে কথা! কাজেই বেশিরভাগ সহকর্মীই অলকদার সঙ্গে সহমত হলেন। আমি আর কথা বাড়ালাম না শুধু স্টেটসম্যান-এ ফোন করে ফটোগ্রাফারকে অভিনন্দন জানালাম।
এই ছবিটা সৌমিত্র ঘোষের তোলা। একটু আলাপ ছিল, মোটসোটা চেহারা, ছোটকরে ছাঁটা চুল। মাঝে মাঝে দেখা হত। খুব মার্জিত, মুখে সবসময় হাসি। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তার এই ছবিটাই আমার মনে গেঁথে ছিল। আমার থেকে দু বছরের ছোট ছিল সৌমিত্র, কিডনির অসুখে মারা গেল। মারা যাবার পাঁচ দিন আগেও ডায়ালিসিসের পর সৌমিত্র বলল, অশোক সাহেব একদিন বাড়ি এস। তোমার ছবিগুলো নিয়ে এবার কিছু একটা করতেই হবে। ছবি ও কাজের জন্য আমি ওকে বরাবর শ্রদ্ধা করতাম। ইন্ডিপেনডেন্ট, স্টেটসম্যান, ইন্ডিয়া টুডে, ডি এন এ, হিন্দুস্তান টাইমস এসব নামী কাগজের ফটোগ্রাফি বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেছে সৌমিত্র। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি তিনটি ভাষাতেই সমান দক্ষ। বলা ও লেখা সবেতেই সমান পটু। এর পাশাপাশি কবিতা,গজল, রবীন্দ্রসঙ্গীত, হিন্দি গান সবকিছুতেই সৌমিত্র আমার ফটোগ্রাফার বন্ধুদের মধ্যে সবার উপরে।
সৌমিত্রর নাকতলার বাড়ির দরজা ছিল সবার জন্য খোলা। বহু ছেলে ওর বাড়িতে দিনের পর দিন থেকে খেয়ে এখন দেশের নানা কাগজে মাথা উঁচু করে কাজ করছে। কলকাতার বহু ফটোগ্রাফারকে ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকরি দিয়েছে। নাকতলার বাড়িটা ছিল আমাদের কাছে একটা বিরাট আকর্ষণ। আনন্দ, হৈহুল্লোড়, আড্ডা সবকিছুর জন্যই আমাদের সৌমিত্রর বাড়ির কথা সবথেকে আগে মনে পড়ত। নানা বিষয়ে তার ভাবনার তীক্ষ্ণতা আমাকে বারবার অবাক করেছে। এককথায় আমি ছিলাম ওর গুণমুগ্ধ। ছবি তোলার কাজে নানা জায়গায় সফরে সৌমিত্র বহুবার আমার সঙ্গী হয়েছে। আমিই বলতাম ওকে যাওয়ার কথা। কারণ, সৌমিত্রর বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে। ও আমার কাজের প্রশংসা করলে আমার লজ্জাই করত। আনন্দবাজারে কাজ করার একটা সুবিধা আছে। কাজের গুণে তেমন বড় না হলেও সবাই বড় ঠাউরে নেয়। সরকার বাড়িতে কোনভাবে ঢুকে পড়া লোকজন এর সুযোগ নেয়।




















