খিচুড়ি একটি ভাত জাতীয় খাবার যা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। প্রধানত চাল এবং মসুর ডাল দিয়ে সাধারণ খিচুড়ি ভাত রান্না করা হলে বজরা, মুগডাল সহ অন্যান্য ডালের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। অঞ্চলভেদে খিচুড়ির বিভিন্ন আঞ্চলিকরূপ পরিলক্ষিত হয়। যেমন নরম খিচুড়ি, ভুনা খিচুড়ি, মাংস খিচুড়ি, নিরামিষ খিচুড়ি ইত্যাদি। খিচুড়ি একটি সহজপাচ্য খাবার তাই শিশুকে প্রথম কঠিন খাবার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় খিচুড়ি খাওয়ানো হয়। হিন্দুদের মধ্যে যারা উপবাসকালে কোনপ্রকার শস্যাদি গ্রহণ করতে চান না ,তারা এসময়ে সাবুদানা খিচুড়ি খেয়ে থাকেন|
গ্রীক দূত সেলুকাস উল্লেখ করেছেন ভারতীয় উপমহাদেশে চালের সাথে ডাল মেশানো খাবার খুবই জনপ্রিয় ছিলো। মরোক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা কিশরির কথা উল্লেখ করেছেন যা চাল এবং মুগ ডাল দিয়ে প্রস্তুত করা হতো।১৫ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে ঘুরতে আসা রাশিয়ান পর্যটক আফনাসিই নিকতিন খিচুড়ির কথা তার লেখায় বর্ণনা করেছেন। চাণক্যের লেখায় মৌর্যযুগের চন্দ্রগুপ্তের শাসনামলে চাল, ডালের মিশ্রণে তৈরি খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়।
গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিসের লেখাতেও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজসভার রান্নাঘরে খিচুড়ির কথা পাওয়া যায়। চানক্য এক গ্রামের মায়ের থেকে গরম খিচুড়ি চারধার থেকে খেতে হয় না হলে হাত পুড়ে যাবে, এই কথা শুনে মগধে আক্রমণের রাস্তা খুঁজে পান বলে প্রচলিত আছে । সুতরাং খিচুড়ি শুধু খাদ্যই নয়, ঐতিহাসিক ঘটনাও বটে!
সপ্তদশ শতকে ফরাসি পরিব্রাজক তাভেরনিয়ের লিখেছেন, সে সময় ভারতের প্রায় সব বাড়িতেই খিচুড়ি খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। আকবরের মন্ত্রী ও ঐতিহাসিক আবুল ফজল রাজকীয় রান্নাঘরে বিভিন্ন ধরনের খিচু়ড়ি রান্নার কথা লিখেছেন। আইন-ই-আকবরিতে বিভিন্ন প্রকার খিচুড়ির প্রস্তুতপ্রণালী পাওয়া যায়। সেখানে আকবর এবং বীরবলের খিচুরি রান্নার একটি গল্প উল্লেখ করা হয়েছে।
মুঘল রান্নাঘরে জাহাঙ্গীরের প্রিয় বিশেষ ধরনের খিচু়ড়ি তৈরি করা হতো পেস্তা, কিসমিস দিয়ে। সেই খিচুড়িকে জাহাঙ্গীর নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজান’। সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রিয় ‘আলমগিরি খিচড়ি’র কথাও জানা যায়। এই খিচড়িতে চাল, ডালের সঙ্গে মেশানো হত বিভিন্ন প্রকার মাছ ও ডিম।
রাজকীয় খাবার হিসেবে হায়দরাবাদের নিজামের রান্নাঘরেও খিচুড়ি জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই খিচুড়ির ভাঁজে ভাজে থাকতো সুস্বাদু মাংসের কিমা। ১৯ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগে দেশে ফেরত ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের হাত ধরে তা ইংল্যান্ডে পৌঁছায়। এই খিচুড়ি জনপ্রিয় ইংলিশ ব্রেকফাস্ট ‘কেদেগিরি’ হয়ে ওঠে।
ঊনিশ শতকের মধ্যভাগে নিম্নবিত্ত মিশরীয়দের মধ্যে কুশারি নামে যে রান্নাটি জনপ্রিয় হয় তা খিচুরীরই ভিন্নরূপ বলা যেতে পারে । এটি তৈরী হতো তুলশীমালা চাল , ডাল , চানা , ভিনিগার , টমেটো সস , পিঁয়াজ , আদা , রসুন ইত্যাদি উপকরন দিয়ে। পরে এই রান্নাটি তাদের সৈন্যশিবিরেও স্থান পায়।
তবে হিন্দু , বৌদ্ধ,জৈন বা শিখ সম্প্রদায়ের পূজা ও আরাধনায় ভক্তদের খিচুড়ি প্রসাদ হিসাবে বিতরণ বিশেষ সামাজিক ব্যবস্থা। বিশেষ করে হিন্দুদের পালাপার্বনে খিচুড়ি গণ ভোজের এক জনপ্রিয় মাধ্যম ।
বন্যা ও অন্যান্য ত্রাণ ব্যাবস্থায় খিচুড়ি খাদ্যরূপে দেয়া হয়ে থাকে।
আজ আমাদের প্রিয় নানা বিষয়ে সুলেখক প্রশান্ত দাস পুজোর ভোগের খিচুড়ি কি ভাবে করা যায় তার প্রণালী দিলেন IBG News এর কলাপাতায় কলরব © Feast on Banana Leaf বিভাগকে । লেখক কে বিশেষ ধন্যবাদ।
With inputs from Wikipedia
ভোগের খিচুড়ি
★★ উপকরণ ★★
- গোবিন্দ ভোগ চাল ২ কাপ
- ভাজা মুগ ডাল ২ কাপ
- আদা কুচি ১ টেবিল চামচ
- কাঁচা লঙ্কা ২-টি
- শুকনোলঙ্কা-১-টি
- তেজপাতা ২টি
- দারচিনি – ১/৩ ইঞ্চি
- ছোট এলাচ- ৪-টি
- লবঙ্গ ৪টি
- নুন- স্বাদ অনুযায়ী
- চিনি আধ চা চামচ
- হলুদ আধ চা চামচ
- সর্ষের তেল ১/৪ কাপ
- ঘি – ২- টেবিল চামচ
- কাজু- গোটা ১০ গ্রাম
- কিসমিস- ১০ গ্রাম
■■ প্রণালী ■■
ডাল শুকনো খোলায় সোনালী আকারে ভেজে নিন। এবার চাল, ভাজা ডাল ভাল করে ধুয়ে ঘন্টাখানেক জলে ভিজিয়ে রেখে দিন। এবার তেল, ঘি, একসঙ্গে গরম করে গোটা গরম মশলা, তেজপাতা ও গোটা শুকনোলঙ্কা ফোড়ন দিন । চাল-ডাল দিয়ে ৮ থেকে ১০ মিনিট ভেজে নিন ।
নুন, হলুদ দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে গরম জল দিয়ে ঢেকে দিন। ফুটে উঠলে গ্যাসের আঁচ কমিয়ে দিন।খিচুড়ির জল কমে গেলে চিনি, ঘি, কাজু, কিসমিস, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ২০ / ২৫ মিনিট দমে রান্না করুন । তৈরি সুস্বাদু ভোগের খিচুড়ি।
গরম গরম ঘী. বেগুন ও অন্যন্য ভাজা ও পায়েসের সাথে নিবেদন করুন ভোগের খিচুড়ি।

Recipe Author
প্রশান্ত দাস মতিঝিল কলেজে অ্যাডমিন বিভাগের দ্বায়িত্বপূর্ন পদে কর্মরত । নানা বিষয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা নিয়ে ব্যাস্ত থাকেন , নতুন নতুন রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট , বাগান ও পরিবেশ সচেতন নাগরিক ও ছাত্রদরদী সোশিওলজির শিক্ষক ।

















