Tuesday, September 29, 2026
WA
Home Bangla বৌদ্ধ সেতো জন্ম সূত্রে, প্রকৃত বৌদ্ধ হতে পারা সে যে বড্ড কঠিন

বৌদ্ধ সেতো জন্ম সূত্রে, প্রকৃত বৌদ্ধ হতে পারা সে যে বড্ড কঠিন

0
783
2567 Buddha Jayanti at Kolkata 1 No, Buddhist Temple Street
2567 Buddha Jayanti at Kolkata 1 No, Buddhist Temple Street

বৌদ্ধ সেতো জন্ম সূত্রে, প্রকৃত বৌদ্ধ হতে পারা সে যে বড্ড কঠিন

DR.DHIRES KUMAR CHOWDHURY
DR.DHIRES KUMAR CHOWDHURY

ড: ধীরেশ চৌধুরী,

জনিত রোগ বিশেষজ্ঞ, “বাঁচবো” মানবিক সংগঠনের কর্ণধার ও বিশিষ্ট সমাজ কর্মী এবং আইবিজি নিউজ এডিটর প্যানেল মেম্বার

বংশগত সূত্রে বৌদ্ধ পরিবারে জন্ম তাই বৌদ্ধ। আবার মজার কথা হলো বৌদ্ধ বংশগত ভাবে হয়েছি বলেই বোধ করি এত সহজে হতে পেরেছি। কারণ প্রকৃত বৌদ্ধ হওয়াটাও যে বড্ড কঠিন। ঠিক যেমনটা সহজ হওয়া যায়না সহজে মোটেই। আমরা যাকে বৌদ্ধ ধর্ম বলি আসলে সেতো একটা পথ। নিজেকে জানার পথ। অত্তোদীপের পথ। মুক্তির পথ। উত্তরণের পথ। পরিশেষে সেই কাঙ্খিত নির্বাণ লাভের পথ। এই পথ কি কোনো ধর্মীয় গন্ডীতে সীমাবদ্ধ হতে পারে। সেটা করতে যাওয়াই তো সংকীর্ণতার পরিচয়। তাই ধর্মীয় পরিচয়ে বৌদ্ধ না হয়েও যাঁরা তাঁর এই পথের অনুসারী সবাই আসলে বৌদ্ধ।

আজ সেই মহামানব তথাগত বুদ্ধের ২৫৬৭ তম আবির্ভাব দিবস। আবার একই সাথে বোধিলাভের মাধ্যমে প্রাজ্ঞতা প্রাপ্তি এবং সর্বোচ্চ মুক্তি অর্থাৎ নির্বাণ এর দিবস। ত্রি স্মৃতি বিজড়িত এই বিশেষ দিন যাকে সারা পৃথিবী জুড়ে পালিত করা হয় বুদ্ধ জয়ন্তী হিসেবে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র দিন। সবচেয়ে বড় উৎসব। যদিও সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের কাছেও এটা মহৎ দিন।

বুদ্ধ আসলে কি?

Buddha Jayanti Celebration at Lumbini, Nepal
Buddha Jayanti Celebration at Lumbini, Nepal

কোনো অবতার? ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা? না একেবারেই নয়। তাঁকে এই পরিচয়ে আবদ্ধ করা একেবারেই সংকীর্ণতার পরিচয়। তিনি আসলে কি সেটা বোঝা যাবে এই সহজ বোধের মাধ্যমে –

“বুদ্ধ যখন অপরিমেয় মৈত্রী মানুষকে দান করেছিলেন তখন তো তিনি কেবল শাস্ত্র প্রচার করেন নি, তিনি মানুষের মনে জাগ্রত করেছিলেন ভক্তি। সেই ভক্তির মধ্যেই যথার্থ মুক্তি।…

মহাপুরুষেরা এইরকম আপন জীবনের প্রদীপ জ্বালান; তাঁরা কেবল তর্ক করেন না, মত প্রচার করেন না। তাঁরা আমাদের দিয়ে যান মানুষরূপে আপনাকে।”

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

“তাই ভাবি, কালের কি কুটিল গতি ! আড়াই হাজার বৎসর পরে আজ পাটলিপুত্র-রচয়িতা মগধের পরাক্রান্ত মহামন্ত্রী বর্ষকারের নাম কেহ শুনিয়াছে কি? কিন্তু শাক্যবংশের সেই রাজভ্রষ্ট যুবরাজ ? আজ অর্ধেক এশিয়া তাঁহার নাম জপ করিতেছে।

সসাগরা পৃথ্বীকে যাহারা বারবনিতার ন্যায় উপভোগ করিয়াছিল, তাহাদের নাম সেই ভুঞ্জিতা ধরিত্রীর ধূলিকণার সাথে মিশিয়া গিয়াছে, আর যে নি:সম্বল রাজভিখারীর একমাত্র সম্বল ছিল নির্বাণ, সেই শাক্যসিংহের (বুদ্ধ) নাম অনির্বাণ শিখার ন্যায় তমসান্ধ মানবকে জ্যোতির পথ নির্দেশ করিতেছে।“

– অমিতাভ , শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বুদ্ধের সামাজিক দর্শন আজ সারা বিশ্বের কাছে আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিকতা লাভ করছে, বিশেষ করে যখন মানবজাতি করোনার মতন একটি অতিমারীর সংকটময় সময় পার করে এলো।

বুদ্ধের শিক্ষাতো আসলে একটা জীবন শৈলী। সকল রকম কায়িক বাচনিক ও মানসিক পাপ বা অকুশল কর্ম থেকে বিরত থেকে চিত্তকে নির্মল করে কর্ম করাই হলো আসলে বুদ্ধের শিক্ষা।

Lord Buddha Buddha and Rahul
Lord Buddha Buddha and Rahul

স্থূল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অতি সহজ, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বুদ্ধের এক্কেবারে প্রাথমিক যে শিক্ষা অর্থাৎ “পঞ্চশীল” এর মধ্যেই কিন্তু নিহিত রয়েছে সমগ্র মানবজাতির উত্তরণের পথ।

● প্রাণী হত্যা না করা – প্রকৃতিতে জীব বৈচিত্রের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রথম কর্তব্য। তিনি কিন্তু অত্যন্ত বাস্তববাদী ছিলেন, তাই খাদ্য খাদকের যে সম্পর্ক তাকে এর জন্য অস্বীকার করেননি।

● অদত্ত বস্তু বা কোনো দ্রব্য চুরি থেকে বিরত থাকা – সামাজিক নিরাপত্তা ও সুস্থিতি নিশ্চিত করতে এটা অবশ্যই পালনীয়।

● মিথ্যা বলা থেকে বিরত – নিজের এবং অপরের শুধু কুশল নয়। মানসিক স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখার জন্য প্ৰথম সোপান।

● অবৈধ কামাচার থেকে বিরত থাকা – বৈবাহিক, পারিবারিক এবং বৃহত্তর অর্থে সামাজিক সম্পর্ককে অটুট রাখার জন্য একেবারেই আবশ্যিক। এই একটি মাত্র কারণ থেকে ভেবে দেখুন বিবাহ বিচ্ছেদ, ধর্ষণ, পারিবারিক কলহ ও হিংসা কিভাবে বাড়ছে আজকে।

● সুরা ও নেশা সেবন থেকে বিরত – একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে সঠিক রাখতে কতটা উপযোগী সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আরও দেখতে গেলে সামাজিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ভীষণ ভাবে জরুরি।

তাঁর প্রদর্শিত ব্রহ্মবিহার-এ যে চারটি মানবিক গুণ অর্থাৎ মৈত্রী, করুণা, মুদিতা এবং উপেক্ষার প্রায়োগিক ব্যবহার মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর নিরন্তর অনুশীলন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানসিক অবস্থা উন্নততর নৈতিকতার পর্যায়ে উন্নীত হয়। এ চারটিকে বলা হয় অপ্রমেয়। এগুলোর সীমা এবং পরিসীমা নেই। সুতরাং মৈত্রী সকল জীবের জন্য, করুণা সকল দুঃখীর জন্য – সমস্ত ধরনের দুখী, মুদিতা সকল উন্নত মননশীল ব্যক্তির জন্য এবং উপেক্ষা ভালো-মন্দ, প্রিয়-অপ্রিয়, সুখ-দুঃখ এই বোধ থেকে উত্তরণ তো আসলে সকল জীবের জন্যেই বিস্তৃত এবং প্রসারিত। সেই জীব যে নিজের স্বার্থ সম্বন্ধে উদাসীন থেকে জগতের সকলের মঙ্গলার্থে এই মহান গুণাবলী গুলির সাধনা করেন, বিশ্ববাসীর প্রতি প্রীতি বহন করেন, তাদের মঙ্গল কামনা করেন, এ চারটি গুণাবলী তাই কোনোভাবে স্থান-কাল-পাত্র বা কোনো গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই বুদ্ধ মহামানব কোনো অবতার নন। আমরা যতই নিজেদের অজ্ঞানতায় তাঁকে ভক্তিভরে পূজা করিনা কেন!

বুদ্ধকে তাই কোনো ধর্মীয় গন্ডিতে আবদ্ধ রাখার অর্থ সংকীর্ণতার পরিচয়। তিনি আসলে ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে সমগ্র মানব জাতির সুস্থ জীবন শৈলী র পথ প্রদর্শক। যিনি যেভাবে তাঁকে দেখতে চান সেভাবেই দেখতে পারেন একজন সংস্কারক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সমাজবিদ, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ, মনোবিদ এমনকি একজন সাম্যবাদী – যেমন জাতিগত – তাঁর চরণে অবারিত দ্বার ছিলো সমাজের উচ্চ থেকে এক্কেবারে নিম্ন প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের এমনকি বারবনিতা পর্যন্ত, লিঙ্গগত – প্রথম দিকে কুণ্ঠা থাকলেও তিনি আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে নারীদের ভিক্ষুণি হিসেবে তাঁর সংঘে স্থান দিয়েছিলেন এই বলিষ্ঠ সাহসী সিদ্ধান্ত একজন প্রকৃত সাম্যবাদী র পক্ষেই সম্ভব, আর বিত্তগত – সেই যুগের প্রথিতযশা রাজা মহারাজেরা যেরকম তাঁর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, ভক্ত ছিলেন তেমনি চন্ডালিকা র মতন অসংখ্য অতি নিম্ন বিত্তের মানুষেরও স্থান হয়েছিলো তাঁর কাছে।

এই কথাগুলো ই আজ তুলে ধরেছি শতাব্দী প্রাচীন প্রতিষ্ঠান, হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে স্বীকৃত বাঙালি বৌদ্ধদের সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যশালী সংগঠন বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা অফ ইন্ডিয়া র আয়োজিত ২৫৬৭ তম বুদ্ধ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রদত্ত বক্তব্যে।

তারই সাথে স্বরচিত দুটি কবিতা পাঠ করার সুযোগ হয়েছিলো যার অন্যতম “যশোধরা – এক অনাম্নী অঙ্গনা”। আজ কিন্তু বুদ্ধের সন্ন্যাস পূর্ববর্তী পত্নী যশোধরা র ও জন্মদিন। যিনি পরবর্তী কালে ভিক্ষুণি হয়েছিলেন। বুদ্ধের মৃত্যুর দুই বছর আগে ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যু তথা নির্বাণ প্রাপ্তি হয়েছিলো যশোধরা। যাঁর কথা কিন্তু বেশিরভাগ মানুষেরই অজ্ঞাত। ইতিহাসেও বিস্মৃত। আর অন্য কবিতাটি তথাগত বুদ্ধকে আর্জি জানিয়ে – “জন্ম নাও আবার”। হিংসা উন্মত্ত পৃথিবীতে আজ যাঁকে সশরীরে বড্ড বেশি প্রয়োজন।

Artist Sutapa Roy
Artist Sutapa Roy

এই অনুষ্ঠানে মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বঙ্গ সরকারের সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান তথা প্রাক্তন লোকসভার সদস্য তথা বিশিষ্ট চিকিৎসক ও প্রাক্তন অধ্যাপিকা অত্যন্ত প্রাজ্ঞ ডাঃ মমতাজ সংঘমিতা। আর বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখিকা ও অধ্যাপিকা তথা অত্যন্ত সুবক্তা, বিশেষ করে নিরপেক্ষ, সাহসী ও স্পষ্ট বক্তা হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত এবং প্রকৃত অর্থে বুদ্ধিজীবী শ্রীমতি মিরাতুন নাহার। সভার সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংঘিক ব্যক্তিত্ব তথা ভারতীয় সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার উপ সংঘরাজ ও পালি ও বৌদ্ধ শাস্ত্র বিশারদ ডঃ রতনশ্রী ভিক্ষু Bhikkhu Ratanasri, যিনি বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা অফ ইন্ডিয়া র সভাপতি ও বটে।

স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই অত্যন্ত সমৃদ্ধ বক্তব্য রাখলেন মিরাতুর ম্যাডাম। বুদ্ধের প্রদর্শিত পথের মূল নির্যাস কে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরলেন তিনি। যা এককথায় অতুলনীয়। শ্রদ্ধেয় রতনশ্রী ভিক্ষু সঠিকভাবে ই যার মূল্যায়ন করেছেন যে – যাঁরা ম্যাডামের এই বক্তব্য শুনতে পেলেন না তাঁরা সত্যিকারের ভালো একটা বক্তব্য কে মিস করলেন।

শ্রদ্ধেয়া মমতাজ ম্যাডামের সাথে অনেকক্ষণ আলাপচারিতার সুযোগ হলো। একই পেশার আবার তার উপরে এরকম শিক্ষিকা। আমার অবশ্যই উপরি পাওনা। খুব সুন্দর ভাবে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বুদ্ধের দৈনন্দিন প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এই কথা ই তুলে ধরলেন ম্যাডাম। শেষে উদাত্ত কণ্ঠে গাইলেন কবি গুরুর সেই গান – “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব;. ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ…” আর সুন্দর সঙ্গতে এই গানটিকে আরও মনোগ্রাহী করলেন অমলেন্দু বাবু।

অত্যন্ত সুচারু ভাবে তাঁর প্রাজ্ঞতায় সভাকে পরিচালিত করেছেন শ্রদ্ধেয় রতনশ্রী ভিক্ষু। আর একই ভাবে প্রাঞ্জল, স্বতঃস্ফূর্ত সঞ্চালনায় সভাকে অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছেন বিশিষ্ট কবি ও দক্ষ পরিচালক শ্রী অমলেন্দু চৌধুরী Amalendu Chowdhury।

সভাশেষে অত্যন্ত সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী ও প্রাসঙ্গিক গীতি আলেখ্য “হে অনন্তপুণ্য” পরিবেশন করেছেন ছায়ানট সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। যা সত্যিকারের প্রশংসা র দাবি রাখে।

সকলে ভালো থাকুন। ভালো রাখুন।

প্রদত্ত নিজ হাতে আঁকা ছবিটি আজকের বিশেষ দিন উপলক্ষে আমাকে পাঠিয়েছেন শ্রীমতি সুতপা রায়, পারিবারিক চিকিৎসক হিসেবে যাঁর পরিবারের সাথে বহু বছর ধরে যুক্ত।

Urban Water Security Week 22-28 May 2023
Urban Water Security Week 22-28 May 2023

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights