আঙ্গুল তুলি বরং নিজের দিকে, নিজেদের দিকে…
সম্প্রতি শেষ হওয়া মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষের দিনের উদযাপন বা সেলিব্রেশন এর রূপ দেখে প্রাথমিক ভাবে ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলাম আমিও। বই এর পাতা কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে হুল্লোড় করে পরীক্ষা শেষের উদযাপন! আরও একটা ভিডিওতে দেখলাম ব্যান্ড পার্টি বাজিয়ে একদল পরীক্ষার্থী ম্যাটাডোর করে শেষের দিনের পরীক্ষা দিতে এসেছে। একটা ভিডিওতে দেখলাম একজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে এসে কোন বিষয়ের পরীক্ষা সেটাই বলতে পারলো না, কিন্তু সেই কনফিডেন্টলি বলছে পাশ করে যাবে কারণ একজনের নাম করে বলছে উনি থাকলে কে পাশ করা থেকে আটকায়?, একজন বলছে রাত তিনটে থেকে সকাল সাতটা অব্ধি অনলাইনে পরীক্ষার্থীরা দল বেঁধে ভিডিও গেম খেলে, এক ঘন্টা শুয়ে পরীক্ষা দিতে চলে এসেছে, একজনকে মাধ্যমিকের পর কি করবে জিজ্ঞাসা করায় উত্তর দিচ্ছে মিয়া খালিফা র ক্যামেরা ম্যান হবে। যাঁদের জানা নেই তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই মিয়া খালিফা হলো বিশ্ব বিখ্যাত পর্নোগ্রাফির নায়িকা। একজন মেয়ে উত্তর দিচ্ছে পরীক্ষায় গার্ড স্যারকে দেখে ক্রাস খেয়ে নাকি যা পড়ে এসেছিল সেসবও ভুলে গেছে। আর এই সব উত্তর দিচ্ছে হেঁসে হেঁসে, বুক উঁচিয়ে। প্রশ্ন কর্তারাও বেশ তাতাচ্ছে ওদের, যাতে এরকম উত্তর আরও পাওয়া যায়, কারণ তাতে ভিউজ বাড়বে, টাকা পাবে!
এসব শুনে দেখে আমরা বড়রা রেই রেই করে বলছি সমাজটা এক্কেবারে উচ্ছন্নে গেলো। এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা একেবারেই অমানুষ হয়ে গেলো। ভাবটা এমন আমরা সব ভীষণ রকমের উৎকর্ষ, ভালো, নৈতিকতায় পরিপূর্ণ, ত্রুটি বর্জিত মানুষজন আর প্রজন্ম। আমরা সব সতী সাবিত্রী। যত্ত দোষ ওদের। কিন্তু ভেবে দেখুন ওরা হচ্ছে সবাই বছর ১৫/১৬ র কিশোর কিশোরী। ম্যাচিয়ুরিটি বা পরিপক্বতা সেই অর্থে ওদের এখনও আসেনি বা আসার কথা নয়। এর উত্তরে আপনারা অনেকেই বলবেন তাহলে সেই অর্থে অ্যাডাল্ট জিনিসগুলো ওরা করছে কি করে? প্রেম, ফ্রি সেক্স, পর্নো ছবিতে আসক্তি, এমনকি বিকৃত কিছু যৌনাচার, ধূমপান, মদ্যপানের নেশা ছাড়িয়ে আরও বিভিন্ন ধরনের নেশা (অনেক কিছু আমার জানার বাইরে) এসব কেন তবে ওদের মধ্যে। দিনে দিনে বাড়ছে বৈ কমছে না। এগুলো কি পরিপক্কতার লক্ষণ নয়! আমাদের সময় কি এসব হতো???
একেবারেই ঠিক, কিন্তু সেটা যদি আমরা উপরিগত ভাবে বিশ্লেষণ করি। যদি গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করেন বা সেটা করার তাগিদ অনুভব করেন বা সেই দম থাকে তাহলে দেখবেন এসবের জন্য ওদের থেকেও অনেক বেশি বেশি দায়ী আমরা। তথাকথিত ম্যাচিউরড লোকজন। আসলে ওদের এই অপরিপক্বতাকেই তো কাজে লাগাচ্ছি আমরা। আমাদের নিজেদের স্বার্থে। ওদের এই অপরিপক্বতা না থাকলে কোথায় যাবে আমাদের ব্যবসা, আমাদের মুনাফা, আমাদের বিলাসিতা, আমাদের টি আর পি, আমাদের ক্ষমতা ধরে রাখার অদম্য প্রয়াস! ওদের সেই অর্থে উচ্ছন্নে যাওয়ার সব উপকরণ সাজিয়ে রাখবো আমরাই আর আমরাই ওদের থেকে সংযম, ব্রহ্মচর্য আশা করবো, কি সুন্দর দ্বিচারিতা তাই না???, একটা মোবাইল হাতে পেলে কি জিনিসে না এক্সপোজ হচ্ছে ওরা! ভেবে দেখেছেন, নিয়ন্ত্রণ আছে কিছু? না সেটা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও আছে কারোর? এই সমস্ত কিছুর পিছনে কারা? সেতো তথাকথিত শিক্ষিত পরিপক্ব মানুষজন তাই না? যাঁদের অনেকেরই বয়স এমনকি ৫০/৬০/৭০। তারাই তৈরি করছেন কিভাবে ওদের অপরিপক্বতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন নেশায় ডুবিয়ে নিজেদের মুনাফা বাড়ানো যায়। সামাজিক মাধ্যমে অশ্লীল রিল গুলো করছেন কোন বয়সের নারী পুরুষেরা? ভেবেছেন একবারও? এতে কোন নিয়ন্ত্রন আছে? কেউ সেটা করার কথা ভেবেছেন? না, কারণ এসবে বুঁদ হয়ে থাকলে আখেরে যে অনেকের লাভ। নারী, মদ আর বিছানার তলায় কোটি কোটি টাকার বাণ্ডিল এ কোন বয়সীরা ধরা পড়ছে? কাদের পরকীয়াকে ফলাও করে মিডিয়া গুলো হাই লাইট করে, টি আর পি বাড়ানোর জন্য? কারা এমনকি নিজেদের বাবা মায়ের দায়িত্বভার কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়, সেই অর্থে সেই ম্যাচিউরড বয়সী লোকজন!, চারপাশের বাতাবরণটাই হচ্ছে খাও, দাও, আনন্দ ফূর্তি আর মস্তি করো। উৎসবে গা ভাসিয়ে দাও, জীবনের ক্রিম সময়টাকে এভাবে কাটিয়ে দেওয়ার এক প্রচ্ছন্ন এমনকি পরোক্ষ উস্কানি। কারা দিচ্ছে? আমাদের বয়সী লোকজনের প্রজন্ম। তারপরও ওদের থেকে আমরা দায়িত্বশীল , নৈতিক, সংযম জীবন শৈলী আশা করবো, কি সুন্দর দ্বিচারিতা!!! সমাজের প্রায় সর্ব ক্ষেত্রেই দুনীতি, ভাঁটবাজ, ভাঁওতাবাজ লোকেরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কথায় কথায় “ভারমে যা” বলা লোক হয়ে যাচ্ছে সমাজের আইকন, অপরাধ করে হাজত থেকে বেরিয়ে বীরের সম্বর্ধনা পাচ্ছে, আইনসভা গুলোতে শিশুদের মতন ঝগড়া ঝগড়ি, গালিগালাজ করে দিন নষ্ট করছে সেই ম্যাচিউরড নির্বাচিত প্রতিনিধি দল, না জেনেও ভুলভাল তথ্য দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার আস্ফালনে, সেখানে অপরিপক্ব ওই বাচ্চা ছেলেমেয়ে গুলোর কাছে আশা করছি পরিপক্বতা! কি প্রহসন? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো কোনো আদর্শ চরিত্র আছে ওদের সামনে? এই প্রলোভন, এই বিষাক্ত পরিবেশ, এই মোবাইলে সব কিছুর এক্সপোজার, এসবের মধ্যে পড়লে আমরা কতজন সংযত, রুচিশীল থাকতে পারতাম সেটা একবারও ভেবে দেখেছেন? ভাবেননি তো? ভাববেনই বা কেন, সেই দায় আছে নাকি আমাদের। শুধু দোষারোপ আর নিন্দা করলেই তো আমাদের সব দায়বদ্ধতা শেষ তাই না? তাই সাহস থাকলে বরং আঙ্গুল তুলি নিজের বা নিজেদের দিকে, তাতে হয়তো বা কিছু টা সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে। ওরা এখনও কাঁচা, মাটি একেবারে শক্ত হয়ে যায়নি, পুরোটা না হলেও বেশ কিছুটা ভালো রূপ দেওয়া যাবে তাকে এখনও, চাই সদিচ্ছা। আমি একেবারেই হতাশ নই, চলুন না কিছুটা সদর্থক চেষ্টা করি, দলগত নাহলে একক, কিছু তো একটা করা যাক…
© ডাঃ ধীরেশ।
১০ই ফাল্গুন, ১৪৩১।















