
ভারতে দারিদ্র্যের উল্লেখযোগ্য হ্রাস, তবে কর্মসংস্থানের গুণমান ও আঞ্চলিক বৈষম্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ: বিশ্বব্যাঙ্ক
২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে উঠে এসেছেন আনুমানিক ৪৯.৬ কোটি মানুষ; গ্রামীণ অর্থনীতি, যুব বেকারত্ব ও মজুরির বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ বিশ্বব্যাঙ্কের
নয়াদিল্লি, ৩১ অক্টোবর ২০২৬: গত এক দশকে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে ভারত। আর্থিক দারিদ্র্য এবং বহুমাত্রিক দারিদ্র্য—উভয় ক্ষেত্রেই দ্রুত উন্নতি ঘটেছে দেশের। তবে বিশ্বব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে, এই সাফল্যের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের গুণমান, আয়বৈষম্য, গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গিয়েছে।
বিশ্বব্যাঙ্কের Poverty & Equity Brief – India, October 2026 অনুযায়ী, ২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা Purchasing Power Parity (PPP) অনুসারে প্রতিদিন ৪.২০ মার্কিন ডলার আয়কে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের দারিদ্র্যসীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই সীমার নিচে বসবাসকারী ভারতীয় জনসংখ্যার হার ২০১১ সালে ৫৭.৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬.১ শতাংশে।
অর্থাৎ, দারিদ্র্যের হার ৪১.৬ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে এবং আনুমানিক ৪৯.৬ কোটি মানুষ ওই নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে উঠে এসেছেন।
অন্যদিকে, প্রতিদিন ৩ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১১ সালের ২৭.১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
এই পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। তবে বিশ্বব্যাঙ্কের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে দারিদ্র্য আরও কমাতে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প সম্প্রসারণ যথেষ্ট হবে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মজুরির উন্নতি এবং স্থায়ী অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১. দারিদ্র্য হ্রাস: ভারতের উল্লেখযোগ্য জাতীয় অগ্রগতি
বিশ্বব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসের মাত্রা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
| সূচক | ২০১১ | ২০২৩ |
|---|---|---|
| দৈনিক ৪.২০ ডলার দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যা | ৫৭.৭% | ১৬.১% |
| দৈনিক ৩ ডলার চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যা | ২৭.১% | ২.৬% |
| ৪.২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে উঠে আসা মানুষের সংখ্যা | — | ৪৯.৬ কোটি |
বিশ্বব্যাঙ্কের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দৈনিক ৪.২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমা অনুসারে ভারতে দারিদ্র্যের হার ২০২৬ সালের ১৪.২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৮ সালে ১২.১ শতাংশে পৌঁছতে পারে।
তবে এগুলি মাইক্রোসিমুলেশন-ভিত্তিক আনুমানিক পূর্বাভাস, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ফলাফল নয়। শ্রমবাজার এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নতুন তথ্য পাওয়া গেলে এই পূর্বাভাস সংশোধিত হতে পারে।
এই অগ্রগতির পিছনে রয়েছে মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ—বিশেষত মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি—এবং খাদ্য ভর্তুকিসহ বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ।
বিশ্লেষণ: ভারতের দারিদ্র্য হ্রাস মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তবে কোনও পরিবার পরিসংখ্যানগত দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে উঠে এলেই যে তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে অথবা ভবিষ্যতের আর্থিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা নয়।
২. গ্রামীণ ভারতে অর্থনৈতিক দুর্বলতা এখনও বেশি
বিশ্বব্যাঙ্কের মূল্যায়নে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের দারিদ্র্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের সমীক্ষাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক ৪.২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমা অনুসারে দারিদ্র্যের হার ছিল:
- গ্রামীণ জনসংখ্যা: ১৯.৩ শতাংশ।
- শহুরে জনসংখ্যা: ৮.৬ শতাংশ।
যদিও দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে গ্রামীণ ভারত তুলনামূলক দ্রুত অগ্রগতি করেছে, তবুও অবশিষ্ট দারিদ্র্যের একটি বড় অংশ এখনও গ্রামীণ এলাকাতেই কেন্দ্রীভূত।
কম উৎপাদনশীলতা, উন্নতমানের কৃষি-বহির্ভূত কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বল পরিকাঠামো গ্রামীণ পরিবারগুলির উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
দারিদ্র্য হ্রাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজন গ্রামীণ পরিকাঠামোর উন্নয়ন, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, গ্রামীণ শিল্পের প্রসার, বাজারের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ এবং কৃষি-বহির্ভূত কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ।
এই পরিসংখ্যান আরও ইঙ্গিত দেয় যে, শুধু জাতীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার দিয়ে দারিদ্র্য হ্রাসের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সুযোগ কতটা সমানভাবে পৌঁছচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. উত্তর ও পূর্ব ভারতে দেশের অবশিষ্ট দারিদ্র্যের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত
বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল ভারতের দারিদ্র্যের ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন।
উত্তরপ্রদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সংলগ্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে দেশের মোট দরিদ্র জনসংখ্যার প্রায় ৫৭ শতাংশ বসবাস করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্য উত্তর ও পূর্ব ভারতের একাধিক অঞ্চলে উন্নয়নের অসম চিত্র তুলে ধরে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও এই পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এই প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের পৃথক দারিদ্র্যের হার উল্লেখ করা হয়নি, তবুও রাজ্যটি চিহ্নিত বৃহত্তর ভৌগোলিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কর্মসংস্থান, গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা, পরিকাঠামো এবং পারিবারিক আয় বৃদ্ধির বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
এই অঞ্চলে দারিদ্র্যের কেন্দ্রীভবনের জাতীয় তাৎপর্যও রয়েছে। ভারতের সামগ্রিক দারিদ্র্য আরও কমাতে হলে এই রাজ্যগুলিতে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষণ: ভারতের পরবর্তী উন্নয়ন পর্যায়ে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে হবে। যেসব রাজ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে স্থায়ী কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
৪. কর্মসংস্থান বেড়েছে, কিন্তু কাজের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে
বিশ্বব্যাঙ্কের অনুমান অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় ১৩.৪ কোটি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বৃদ্ধি একই সময়ে কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যার বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।
এই অগ্রগতির পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে গ্রামীণ মহিলাদের বেতনভিত্তিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের। এর ফলে বহু পরিবারে উপার্জনকারী সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। কর্মসংস্থান বাড়লেও প্রকৃত আয়ের ক্ষেত্রে তার সমতুল্য উন্নতি হয়নি।
বাস্তব মজুরি বা Real Earnings প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের বৃদ্ধির একটি বড় অংশ অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গুণমান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মসংস্থানের সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি নির্ভর করে মজুরি, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগের উপর।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের তুলনায় ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে নয়, বরং প্রতিবেদনে উল্লিখিত Q1 FY2026 থেকে Q1 FY2027 সময়ের মধ্যে যুব বেকারত্বের হার ১৪.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.৯ শতাংশ হয়েছে। বিশেষত গ্রামীণ তরুণীদের মধ্যে এই উদ্বেগ বেশি।
বিশ্লেষণ: ভারতের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এখন শুধু কাজের সুযোগ তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য উৎপাদনশীল, ভালো বেতনের এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করাই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
৫. মহিলাদের কর্মসংস্থান: অগ্রগতি হয়েছে, তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে
গ্রামীণ মহিলাদের বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থানে ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ বিশ্বব্যাঙ্কের মূল্যায়নে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের প্রবেশ পারিবারিক উপার্জন বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে এবং সামগ্রিক দারিদ্র্য হ্রাসেও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
তবে গ্রামীণ তরুণীদের মধ্যে যুব বেকারত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলেই স্থায়ী এবং যথাযথ পারিশ্রমিকযুক্ত কাজ নিশ্চিত হয় না।
ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রে নীতিগত উদ্যোগের প্রধান বিষয় হওয়া উচিত:
- দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ।
- আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি।
- গ্রামীণ উদ্যোগ ও ব্যবসার প্রসার।
- ডিজিটাল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন।
- নিরাপদ ও সহজলভ্য কর্মক্ষেত্র তৈরি।
- মহিলাদের উদ্যোগপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ বৃদ্ধি।
মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং উন্নত আয়ে রূপান্তরিত করা।
৬. আয়বৈষম্য এখনও একটি কাঠামোগত সমস্যা
দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য এখনও প্রকট।
বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ উপার্জনকারীর মধ্যম আয় সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ উপার্জনকারীর মধ্যম আয়ের তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ বেশি ছিল।
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণের সুফল শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের Gini Index-এর মান ২৩.০ এবং Prosperity Gap-এর মান ৪.৯ উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সূচকগুলি আয়বণ্টন এবং অর্থনৈতিক কল্যাণের বৈষম্য বোঝার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—Gini Index এবং মজুরির বৈষম্য একই বিষয় নয়। Gini Index সামগ্রিক বণ্টনগত বৈষম্য পরিমাপ করে, অন্যদিকে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ কর্মীর মধ্যম আয়ের তুলনা শ্রমবাজারে উপার্জনের ব্যবধান তুলে ধরে।
অতএব, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আয়বৈষম্য—এই দুটি বিষয়কে পরস্পর সম্পর্কিত হলেও পৃথক উন্নয়ন সূচক হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
৭. বহুমাত্রিক দারিদ্র্য: শিক্ষা ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ
দারিদ্র্য শুধু আয়ের অভাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না। শিক্ষা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য এবং স্যানিটেশনের মতো মৌলিক পরিষেবার অভাবও দারিদ্র্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিশ্বব্যাঙ্কের মূল্যায়ন অনুযায়ী, Oxford Poverty and Human Development Initiative (OPHI)-এর বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে ভারতে দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ সালের ৫৩.৮ শতাংশ থেকে কমে ২০১৯-২১ সালে ১৬.৪ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাঙ্কের নিজস্ব Multidimensional Poverty Measure অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে এই হার ছিল ১৫.৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন বঞ্চনার যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে, তা হল:
| বঞ্চনার সূচক | জনসংখ্যার হার |
|---|---|
| দৈনিক মাথাপিছু ব্যয় ৩ ডলারের নিচে | ৫.৩% |
| কোনও প্রাপ্তবয়স্কের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ না হওয়া | ১৩.৮% |
| ন্যূনতম মানসম্পন্ন পানীয় জলের অভাব | ৬.৪% |
| ন্যূনতম মানসম্পন্ন স্যানিটেশনের অভাব | ২৯.৬% |
| বিদ্যুতের সুবিধা না থাকা | ১.০% |
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল স্যানিটেশনের ঘাটতি। প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্ট সূচক অনুযায়ী, জনসংখ্যার ২৯.৬ শতাংশ এখনও পর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এই তথ্য জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
৮. শিক্ষার সঙ্গে দারিদ্র্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
বিশ্বব্যাঙ্কের দারিদ্র্যভিত্তিক জনসংখ্যা বিশ্লেষণে শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং দারিদ্র্যের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখা যায়।
দৈনিক ৪.২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতাভিত্তিক দারিদ্র্যের হার হল:
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | দারিদ্র্যের হার |
|---|---|
| কোনও শিক্ষা নেই | ২১.৩% |
| প্রাথমিক শিক্ষা | ১৭.৩% |
| মাধ্যমিক শিক্ষা | ১৪.০% |
| উচ্চশিক্ষা / মাধ্যমিক-পরবর্তী শিক্ষা | ৭.৪% |
পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে দারিদ্র্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।
এই তথ্য শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, শিক্ষার গুণমান বৃদ্ধি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরির গুরুত্বকে আরও জোরালো করে।
৯. শিশু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ নজর প্রয়োজন
বয়সভিত্তিক দারিদ্র্যের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শিশুদের মধ্যে দারিদ্র্যের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
দৈনিক ৪.২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমা অনুসারে বিভিন্ন বয়সের মানুষের দারিদ্র্যের হার:
| বয়সের বিভাগ | দারিদ্র্যের হার |
|---|---|
| ০–১৪ বছর | ২১.৮% |
| ১৫–৬৪ বছর | ১৪.৪% |
| ৬৫ বছর ও তার বেশি | ১৪.০% |
দেখা যাচ্ছে, কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যার তুলনায় শিশুদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের উপর।
শৈশবের দারিদ্র্য দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শিশুদের দারিদ্র্য হ্রাস করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
১০. পরিসংখ্যানগত অগ্রগতি মূল্যায়নে পদ্ধতিগত সতর্কতা প্রয়োজন
বিশ্বব্যাঙ্ক তার প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্যের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছে।
দারিদ্র্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান পারিবারিক সমীক্ষার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে:
- ২০১১-১২ সালের Consumer Expenditure Survey (CES)।
- ২০২২-২৩ সালের Household Consumption Expenditure Survey (HCES)।
- ২০২৩-২৪ সালের Household Consumption Expenditure Survey (HCES)।
মূল্যায়নে Modified Mixed Reference Period (MMRP) পদ্ধতির ভিত্তিতে পারিবারিক কল্যাণের সূচক তৈরি করা হয়েছে এবং স্থান ও সময় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাঙ্কের মতে, এই সমীক্ষাগুলি সামগ্রিকভাবে তুলনাযোগ্য হলেও ২০২২-২৩ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে পরিলক্ষিত উল্লেখযোগ্য কল্যাণ বৃদ্ধির একটি অংশ উন্নত পরিমাপ পদ্ধতির ফলও হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সমীক্ষায় উচ্চ আয়ের পরিবারগুলির প্রকৃত ভোগব্যয়ের সম্পূর্ণ চিত্র প্রতিফলিত নাও হতে পারে। ফলে আয়বৈষম্যের প্রকৃত মাত্রা কিছুটা কম হিসেবেও উঠে আসতে পারে।
গ্রামীণ ও শহুরে জনসংখ্যার অনুপাত নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সমীক্ষার ওজন নির্ধারণে এখনও ২০১১ সালের জনগণনার কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে দ্রুত নগরায়ণের কারণে বর্তমান শহুরে জনসংখ্যার অংশ কম এবং গ্রামীণ জনসংখ্যার অংশ বেশি হিসেবে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতাগুলি দারিদ্র্য হ্রাসের সামগ্রিক অগ্রগতিকে অস্বীকার করে না। তবে পরিবর্তনের সঠিক মাত্রা এবং তার বণ্টন বুঝতে এই বিষয়গুলি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
১১. পরবর্তী উন্নয়নের লক্ষ্য: দারিদ্র্য হ্রাস থেকে সবার জন্য সমৃদ্ধি
বিশ্বব্যাঙ্কের অক্টোবর ২০২৬-এর মূল্যায়ন ভারতের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একদিকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য, অন্যদিকে অবশিষ্ট কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে।
চরম ও মাঝারি দারিদ্র্য হ্রাসে ভারত যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেছে। কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ, পারিবারিক ভোগব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সহায়তা প্রকল্প এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে অবশিষ্ট দারিদ্র্য এখন ক্রমশ নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠী এবং ভৌগোলিক অঞ্চলে বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
গ্রামীণ পরিবার, শিশু, সীমিত শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ এবং কম উৎপাদনশীল পেশায় নিযুক্ত শ্রমিকরা এখনও তুলনামূলক বেশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
উত্তরপ্রদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে ভারতের দরিদ্র জনসংখ্যার প্রায় ৫৭ শতাংশের বসবাস ভবিষ্যতের দারিদ্র্য হ্রাসে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে—উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের পরিকাঠামোগত ঘাটতি দূর করা।
ভারতের পরবর্তী উন্নয়নের সাফল্য শুধু কতজন মানুষ দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে উঠে এলেন, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। কতগুলি পরিবার স্থায়ী আয়, উন্নত জীবনযাত্রা এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জন করতে পারল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্বব্যাঙ্কের এই মূল্যায়নের মূল বক্তব্য স্পষ্ট—ভারত দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, কিন্তু সেই সাফল্যকে সর্বস্তরের মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করার কাজ এখনও অসম্পূর্ণ।
লেখক: অনিল পি. কাস্তুয়ার | সম্পাদক, IBG NEWS
প্রাথমিক তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাঙ্ক, Poverty & Equity Brief – India, October 2026।
তথ্য সংক্রান্ত দ্রষ্টব্য: আর্থিক দারিদ্র্যের পরিসংখ্যান মূলত ২০২৩ সালের তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য এবং শ্রমবাজারের সূচকগুলির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিবেদনে উল্লেখিত পৃথক সময়কাল অনুসরণ করা হয়েছে।

















