নারীরা কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন? অবিশ্বস্ততার নেপথ্যে ১০টি গবেষণাভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ
সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব, আবেগের চাহিদা, ব্যক্তিত্ব, মানসিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বাসভঙ্গের কারণ নিয়ে একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ।
লেখক: সুমন মুন্সী | IBG NEWS
ভূমিকা: পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া নারীদের কি নির্দিষ্ট কোনও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য থাকে?
পরকীয়া বা সম্পর্কের বাইরে গোপন প্রেমের সম্পর্ক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। যখন কোনও নারী তাঁর স্বামী বা নির্দিষ্ট জীবনসঙ্গীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে গোপন আবেগীয় কিংবা শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।
তিনি কি নিজের সম্পর্কে অসুখী ছিলেন? তিনি কি ভালোবাসা, মানসিক স্বীকৃতি, মনোযোগ কিংবা নতুন কোনও উত্তেজনা খুঁজছিলেন? সিদ্ধান্তটি কি হঠাৎ আবেগের বশে নেওয়া, নাকি এর পিছনে দীর্ঘদিনের কোনও মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা কাজ করেছিল?
জনপ্রিয় সমাজে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া নারীদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার প্রবণতা রয়েছে। যেমন—অতিরিক্ত মনোযোগপ্রত্যাশী, প্রতিশ্রুতিতে অনাগ্রহী, আবেগগতভাবে দূরত্ব বজায় রাখা কিংবা অভ্যাসগতভাবে অবিশ্বস্ত ব্যক্তি। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এই ধরনের সরলীকৃত শ্রেণিবিভাগকে সমর্থন করে না।
বৈজ্ঞানিকভাবে এমন কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, সামাজিক অবস্থান বা জীবনযাপন পদ্ধতি চিহ্নিত হয়নি, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায় কোনও নারী তাঁর সঙ্গীর প্রতি অবিশ্বস্ত হবেন।
বরং গবেষণায় দেখা যায়, ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, সম্পর্কের সমস্যা, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, সুযোগ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবে পরকীয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বৈশিষ্ট্যগুলি শুধু নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এগুলির সঙ্গে অবিশ্বস্ততার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এই দশটি বৈশিষ্ট্যের একটি বা একাধিক কারও মধ্যে থাকলেই তিনি অবিশ্বস্ত হবেন, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। বহু মানুষ এই ধরনের মানসিক বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও সারা জীবন বিশ্বস্ত সম্পর্ক বজায় রাখেন।
এই প্রতিবেদনে গবেষণায় উঠে আসা দশটি মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বিষয় সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
১. উদ্বিগ্ন মানসিক সংযুক্তি এবং বারবার আশ্বাস পাওয়ার প্রয়োজন
পরকীয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হলো অনিরাপদ মানসিক সংযুক্তি বা Insecure Attachment।
মনোবিজ্ঞানের Attachment Theory অনুযায়ী, একজন মানুষ ঘনিষ্ঠতা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, প্রত্যাখ্যান এবং বিচ্ছেদের পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা তাঁর মানসিক সংযুক্তির ধরন দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
যাঁদের মধ্যে Anxious Attachment বা উদ্বিগ্ন সংযুক্তির প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের মধ্যে দেখা যেতে পারে:
- সঙ্গীর কাছ থেকে বারবার ভালোবাসা ও আশ্বাস পাওয়ার প্রয়োজন।
- পরিত্যক্ত বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়।
- নিজের আত্মবিশ্বাসের জন্য অন্যের স্বীকৃতির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
- সঙ্গীর সামান্য মানসিক দূরত্বেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া।
- সম্পর্কের ছোট পরিবর্তনকেও ভালোবাসা কমে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা।
২০২৪ সালে Heliyon জার্নালে প্রকাশিত একটি Systematic Review ও Meta-analysis-এ ১৭টি গবেষণার মোট ১৩,৬৬৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে উদ্বিগ্ন মানসিক সংযুক্তি এবং দাম্পত্য অবিশ্বস্ততার মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়।
তবে এই সম্পর্কের মাত্রা সীমিত। উদ্বিগ্ন মানসিক সংযুক্তি থাকলেই কেউ অবিশ্বস্ত হবেন, এমন নয়।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: নিজের সম্পর্কের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে মানসিক নিরাপত্তা তৈরি না করে বারবার অন্যের কাছ থেকে সেই আশ্বাস খুঁজতে থাকলে সম্পর্কের দুর্বলতা তৈরি হতে পারে।
২. আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলা বা Avoidant Attachment
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা হলো Avoidant Attachment বা এড়িয়ে চলার মানসিক সংযুক্তি।
এই ধরনের প্রবণতা থাকা ব্যক্তিরা অনেক সময় অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরতা পছন্দ করেন না। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা কিংবা গভীর আবেগ নিয়ে আলোচনা করাও তাঁদের কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে।
এ ধরনের ব্যক্তির মধ্যে দেখা যেতে পারে:
- আবেগীয় নির্ভরতায় অস্বস্তি।
- নিজের দুর্বলতা বা অনুভূতি প্রকাশে অনীহা।
- সম্পর্কের সমস্যা হলে আলোচনা না করে দূরে সরে যাওয়া।
- আবেগ ও অনুভূতি নিয়ে গুরুতর আলোচনা এড়িয়ে চলা।
- ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া।
২০২৪ সালের একই Meta-analysis-এ Avoidant Attachment এবং দাম্পত্য অবিশ্বস্ততার মধ্যেও একটি সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে।
তবে স্বাধীনচেতা হওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা পছন্দ করা কিংবা নিজের জন্য সময় চাওয়া কখনোই পরকীয়ার প্রমাণ নয়।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে অসুবিধা সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির নিজের সিদ্ধান্ত ও আচরণই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. অন্যের স্বীকৃতি ও প্রশংসার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
প্রত্যেক মানুষই প্রশংসা, ভালোবাসা এবং স্বীকৃতি পেতে পছন্দ করেন। কিন্তু যখন কোনও ব্যক্তির আত্মসম্মান বা নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা সম্পূর্ণভাবে অন্যের প্রশংসার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এর কয়েকটি সম্ভাব্য লক্ষণ হলো:
- নিজের সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয়তা নিয়ে বারবার প্রশংসা পাওয়ার প্রয়োজন।
- অন্যের প্রশংসা ছাড়া আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে অসুবিধা।
- রোমান্টিক মনোযোগের উপর অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরতা।
- অন্যের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার মাধ্যমে নিজের মূল্য খুঁজে পাওয়া।
- মনোযোগ পাওয়াকে আত্মসম্মান বৃদ্ধির প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখা।
পরকীয়ার কারণ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি আত্মসম্মান বৃদ্ধি এবং অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে সম্পর্কের বাইরে জড়িয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে প্রশংসা পছন্দ করা, বন্ধুত্ব বজায় রাখা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকা অবিশ্বস্ততার পূর্বাভাস নয়।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: প্রশংসা উপভোগ করা স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের মানসিক আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে অন্যের রোমান্টিক মনোযোগের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৪. নিজের বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে গভীর অসন্তুষ্টি
সম্পর্কের প্রতি অসন্তুষ্টি পরকীয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলির একটি।
দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের সমস্যা তৈরি হলে একজন মানুষ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
এর মধ্যে থাকতে পারে:
- বারবার ঝগড়া ও মতবিরোধ।
- ভালোবাসা ও স্নেহের অভাব।
- মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়া।
- নিজেকে অবহেলিত বা অমূল্যায়িত মনে করা।
- যৌন চাহিদা ও প্রত্যাশার মধ্যে অসামঞ্জস্য।
- যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার অভাব।
২০১৯ সালে The Journal of Sexual Medicine জার্নালে প্রকাশিত একটি Systematic Review-এ পরকীয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে ব্যক্তিগত কারণের পাশাপাশি সম্পর্কের পারস্পরিক সমস্যা ও অসামঞ্জস্যের গুরুত্ব উঠে আসে।
তবে সম্পর্কের অসন্তুষ্টি একাই পরকীয়ার কারণ নয় এবং এটি বিশ্বাসভঙ্গের কোনও অজুহাতও হতে পারে না। বহু অসুখী দম্পতিও একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন। আবার আপাতদৃষ্টিতে সুখী সম্পর্কেও পরকীয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: সম্পর্কের অসন্তুষ্টি দুর্বলতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের দায় অন্যের উপর চাপানো যায় না।
৫. সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা বা Commitment-এর অভাব
সম্পর্কে থাকা মানেই প্রকৃত অর্থে দায়বদ্ধ হওয়া নয়।
একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কের অর্থ হলো পারস্পরিক দায়িত্ব, বিশ্বাস এবং একে অপরের প্রতি নির্ধারিত সীমারেখাকে সম্মান করা।
যাঁদের মধ্যে সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা কম, তাঁদের মধ্যে দেখা যেতে পারে:
- বিকল্প রোমান্টিক সম্পর্কের সম্ভাবনা খোলা রাখা।
- ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর আলোচনা এড়িয়ে চলা।
- সম্পর্কের একনিষ্ঠতার গুরুত্ব কম দেওয়া।
- পারস্পরিক সীমারেখা রক্ষা করার বিষয়ে অনীহা।
- দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ।
গবেষণায় সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে কম দায়বদ্ধতা বা Low Commitment-এর বিষয়টি উঠে এসেছে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: অন্য কারও প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। কিন্তু নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা নির্ভর করে মূল্যবোধ, সততা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপর।
৬. ব্যক্তিগত ও আবেগীয় সীমারেখা বজায় রাখতে অসুবিধা
যে কোনও সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস এবং পরিষ্কার সীমারেখা।
সম্পর্কের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা বা স্বাভাবিক সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা কোনও অপরাধ নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন সেই যোগাযোগ গোপন রোমান্টিক সম্পর্ক কিংবা এমন আবেগীয় ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়, যা সঙ্গীর সঙ্গে করা পারস্পরিক চুক্তি ভঙ্গ করে।
সম্ভাব্য আচরণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- গোপনে রোমান্টিক কথোপকথন চালানো।
- ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের রোমান্টিক মনোযোগ উৎসাহিত করা।
- আবেগীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ লুকিয়ে রাখা।
- পারস্পরিকভাবে নির্ধারিত সীমারেখা বারবার অতিক্রম করা।
- অনুপযুক্ত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করা।
এখানে মনে রাখা জরুরি, বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ পরকীয়ার প্রমাণ নয়।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: সুস্থ সীমারেখা সম্পর্কের বিশ্বাস রক্ষা করে, একই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেও সম্মান করে।
৭. নতুন অভিজ্ঞতা ও যৌন বৈচিত্র্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ
মানুষের যৌনতা এবং সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একরকম নয়।
কেউ আবেগীয় প্রতিশ্রুতি ছাড়া যৌন সম্পর্কে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আবার কেউ কেউ তুলনামূলকভাবে কম আবেগীয় দায়বদ্ধতার মধ্যেও যৌন সম্পর্ককে গ্রহণযোগ্য মনে করতে পারেন।
মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে Sociosexual Orientation বা যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগীয় প্রতিশ্রুতির প্রয়োজনীয়তার মাত্রা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়।
পরকীয়ার কারণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় নতুন অভিজ্ঞতা, যৌন বৈচিত্র্য এবং একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে।
তবে নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আকর্ষণ থাকলেই কেউ নিজের প্রতিশ্রুত সম্পর্ক ভাঙবেন, এমন নয়।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: আকর্ষণ এবং আচরণ এক বিষয় নয়। কোনও আকর্ষণকে বাস্তব সম্পর্কে পরিণত করা হবে কি না, তা নির্ভর করে ব্যক্তির মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্তের উপর।
৮. জমে থাকা রাগ, মানসিক আঘাত ও ক্ষোভ
কিছু ক্ষেত্রে পরকীয়ার পিছনে দীর্ঘদিনের মানসিক কষ্ট, অবহেলা, অপমান কিংবা জমে থাকা ক্ষোভ কাজ করতে পারে।
একজন মানুষ অনুভব করতে পারেন:
- সঙ্গীর কাছ থেকে অবহেলিত হচ্ছেন।
- ভালোবাসা বা স্বীকৃতি পাচ্ছেন না।
- বারবার প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন।
- অপমানিত বা অসম্মানিত হয়েছেন।
- দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা তাঁকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পরকীয়ার কারণ নিয়ে গবেষণায় রাগ, অবহেলা এবং সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের বিষয়গুলি উঠে এসেছে।
কিছু মানুষ প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা থেকেও অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
তবে মানসিক কষ্ট পাওয়া মানেই কেউ অবিশ্বস্ত হবেন, এমন নয়। একইভাবে মানসিক যন্ত্রণাও বিশ্বাসভঙ্গের নৈতিক অজুহাত হতে পারে না।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: সম্পর্কের কষ্টের সমাধান হিসেবে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া অনেক সময় মূল সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
৯. আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও Impulsivity
প্রত্যেকটি পরকীয়া দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।
কিছু ঘটনা ঘটে হঠাৎ আবেগ, দুর্বল বিচারবোধ কিংবা পরিস্থিতির সুযোগের কারণে।
এর মধ্যে থাকতে পারে:
- তীব্র মানসিক সংকটের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া।
- ভুল বিচারবোধের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ।
- মদ্যপ অবস্থায় আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানো।
- অত্যন্ত আবেগঘন সামাজিক পরিস্থিতি।
- মুহূর্তের উত্তেজনায় পরিণতি বিবেচনা না করা।
পরকীয়ার কারণ নিয়ে গবেষণায় পরিস্থিতিগত প্রভাব, সুযোগ এবং মদ্যপ অবস্থার মতো বিষয়গুলিও কিছু অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে।
তবে মদ্যপান কাউকে পরকীয়ায় বাধ্য করে না এবং এটি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয় না।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা একটি সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
১০. অসততাকে যুক্তি দিয়ে বৈধ প্রমাণ করার প্রবণতা
বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত বিষয়গুলির একটি হলো নিজের অসততাকে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা।
কিছু ব্যক্তি নিজেদের কাছে এমন ব্যাখ্যা তৈরি করেন:
- “আমার সঙ্গী আমাকে বোঝে না।”
- “আমারও তো কিছু পাওয়ার অধিকার রয়েছে।”
- “এটা শুধু আবেগের সম্পর্ক, শারীরিক কিছু নয়।”
- “কেউ জানতে পারবে না, তাই কারও ক্ষতি হবে না।”
- “আমি দুটি সম্পর্কই সামলে নিতে পারব।”
এই ধরনের যুক্তি একজন মানুষের মধ্যে অপরাধবোধ কমিয়ে দিতে পারে এবং অসততাকে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের ভুলের দায়িত্ব স্বীকার করার পরিবর্তে অন্যের উপর দায় চাপানোর প্রবণতা।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: বিশ্বাসের ভিত্তি হলো সততা এবং নিজের কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করার মানসিকতা।
গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সতর্কীকরণ
এই প্রতিবেদনে আলোচিত দশটি বিষয় কোনও ব্যক্তিকে অবিশ্বস্ত হিসেবে চিহ্নিত করার তালিকা, চিকিৎসাগত নির্ণয় বা নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণীর পদ্ধতি নয়।
উদ্বিগ্ন মানসিক সংযুক্তি এবং সম্পর্কের অসন্তুষ্টির মতো কয়েকটি বিষয়ের পক্ষে তুলনামূলকভাবে বেশি গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে। অন্য কয়েকটি বিষয় বৃহত্তর সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা এবং মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। এগুলিকে প্রত্যেকটি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, কোনও একটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে নিশ্চিতভাবে কারও বিশ্বস্ততা বা অবিশ্বস্ততা নির্ধারণ করা যায় না।
নারী ও পুরুষের মধ্যে পরকীয়ার প্রবণতা: গবেষণা কী বলছে?
সাধারণ ধারণা অনুযায়ী অনেকেই মনে করেন, নারী অথবা পুরুষ—কোনও একটি পক্ষ স্বভাবগতভাবে বেশি অবিশ্বস্ত। কিন্তু গবেষণা এই বিষয়ে এত সরল সিদ্ধান্ত সমর্থন করে না।
গবেষক Frank D. Fincham এবং Ross W. May-এর একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে পরকীয়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য পরিবর্তিত হয়েছে এবং কিছু গবেষণায় এই ব্যবধান কমে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অন্য একটি গবেষণায় বিষমকামী দম্পতিদের মধ্যে:
- ২৩.২ শতাংশ পুরুষ
- ১৯.২ শতাংশ নারী
তাঁদের বর্তমান সম্পর্কের সময় যৌন অবিশ্বস্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন।
সেই গবেষণায় নারীদের ক্ষেত্রে সম্পর্কের সুখ এবং যৌন মূল্যবোধের সামঞ্জস্যকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তবে এই পরিসংখ্যানকে সমগ্র বিশ্বের নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। এটি নির্দিষ্ট গবেষণার অংশগ্রহণকারী, সংজ্ঞা এবং সময়কালের উপর নির্ভরশীল।
মূল শিক্ষা হলো, শুধুমাত্র নারী বা পুরুষ হওয়ার ভিত্তিতে অবিশ্বস্ততার মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা যায় না।
আবেগীয়, শারীরিক ও ডিজিটাল পরকীয়া: পার্থক্য কোথায়?
পরকীয়া মানেই শুধু শারীরিক সম্পর্ক নয়। আধুনিক সময়ে আবেগীয় এবং ডিজিটাল যোগাযোগও অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের নির্ধারিত সীমারেখা ভঙ্গ করতে পারে।
১. আবেগীয় পরকীয়া (Emotional Infidelity)
নিজের সঙ্গীর অজান্তে অন্য কারও সঙ্গে গোপন আবেগীয় বা রোমান্টিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা এবং সেই সম্পর্ক লুকিয়ে রাখা।
২. শারীরিক পরকীয়া (Physical Infidelity)
সম্পর্কের পারস্পরিকভাবে নির্ধারিত সীমারেখা ভঙ্গ করে অন্য কারও সঙ্গে যৌন বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়া।
৩. ডিজিটাল পরকীয়া (Digital Infidelity)
গোপন রোমান্টিক মেসেজ, অনলাইন যৌন যোগাযোগ, ভার্চুয়াল সম্পর্ক লুকিয়ে রাখা অথবা একনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও গোপনে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করা।
প্রতিটি দম্পতির সম্পর্কের সীমারেখা আলাদা হতে পারে। তবে বিশ্বাস, সততা এবং পারস্পরিকভাবে নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ হচ্ছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সাতটি বিষয় যা কোনও নারী পরকীয়ায় জড়িয়েছেন, তার প্রমাণ নয়
ভুল সন্দেহ এবং অমূলক অভিযোগ একটি সুস্থ সম্পর্ককেও ধ্বংস করতে পারে। তাই কয়েকটি সাধারণ আচরণকে কখনোই পরকীয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
১. পুরুষ বন্ধু বা সহকর্মী থাকা।
২. আকর্ষণীয় বা ফ্যাশনেবল পোশাক পরা।
৩. সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকা।
৪. একা ভ্রমণ করা বা স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করা।
৫. আর্থিকভাবে সফল হওয়া।
৬. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নিজের জন্য সময় চাওয়া।
৭. আত্মবিশ্বাসী, মিশুক বা সামাজিকভাবে জনপ্রিয় হওয়া।
সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সম্মানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
পরকীয়ার পরেও কি সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে?
হ্যাঁ, কিছু সম্পর্ক পরকীয়ার মতো গভীর আঘাতের পরেও পুনরায় গড়ে উঠতে পারে। তবে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
সাধারণত সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন:
- কী ঘটেছে তা সততার সঙ্গে স্বীকার করা।
- প্রতারণামূলক সম্পর্ক বা আচরণের অবসান ঘটানো।
- নিজের কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করা।
- মানসিকভাবে সুস্থ হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।
- সম্পর্কের মধ্যে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা।
- নতুন করে পারস্পরিক সীমারেখা নির্ধারণ করা।
- প্রয়োজন হলে পেশাদার কাউন্সেলিং নেওয়া।
তবে যিনি বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়েছেন, তাঁর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার অধিকারও রয়েছে। ক্ষমা করা কিংবা সম্পর্ক পুনরায় চালিয়ে যাওয়া কখনোই বাধ্যতামূলক নয়।
উপসংহার: পরকীয়া নারী বা পুরুষের পরিচয় নয়, এটি মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তের বিষয়
“কোন ধরনের নারী পরকীয়া করেন?”—এই প্রশ্নের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:
কোন কোন মনস্তাত্ত্বিক, আবেগীয় এবং পরিস্থিতিগত বিষয় একজন মানুষকে নিজের সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার দিকে ঠেলে দিতে পারে?
গবেষণায় উদ্বিগ্ন মানসিক সংযুক্তি, সম্পর্কের অসন্তুষ্টি, দায়বদ্ধতার অভাব, দুর্বল ব্যক্তিগত সীমারেখা, রাগ, অন্যের স্বীকৃতির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, নতুন অভিজ্ঞতার আকাঙ্ক্ষা, পরিস্থিতিগত প্রভাব এবং অসততাকে যুক্তি দিয়ে বৈধ করার প্রবণতার মতো বিষয় উঠে এসেছে।
কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যগুলির কোনওটিই একা কোনও ব্যক্তির বিশ্বস্ততা বা অবিশ্বস্ততা নির্ধারণ করতে পারে না।
একজন আত্মবিশ্বাসী নারী মানেই অবিশ্বস্ত নন। একজন স্বাধীনচেতা নারী মানেই আবেগগতভাবে দূরত্ব বজায় রাখেন না। একজন সামাজিকভাবে সক্রিয় নারী মানেই অন্য সঙ্গী খুঁজছেন না। একইভাবে শান্ত, নিরীহ বা আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত অনুগত কোনও ব্যক্তিও বিশ্বাসভঙ্গ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত—এমন নিশ্চয়তা নেই।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বস্ততা নির্ধারিত হয় না বাহ্যিক সৌন্দর্য, সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা, আয়, লিঙ্গ কিংবা ব্যক্তিত্বের কোনও বিশেষ পরিচয় দিয়ে।
বিশ্বস্ততার প্রকৃত ভিত্তি হলো সততা, মানসিক পরিপক্বতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, পারস্পরিক সম্মান, যোগাযোগ এবং সম্পর্কের প্রতি আন্তরিক দায়বদ্ধতা।
একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ কিংবা নজরদারি নয়। বরং এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে দুজন মানুষ প্রতিদিন নিজেদের ইচ্ছায় সততা, বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধকে বেছে নেন।
IBG NEWS | মনস্তত্ত্ব, সম্পর্ক ও সমাজ
গবেষণার সূত্র ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
এই প্রতিবেদনে নিম্নলিখিত প্রকাশিত গবেষণাগুলির তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে:
১. Ghiasi, N., Rasoal, D., Haseli, A. and Feli, R. (2024). The Interplay of Attachment Styles and Marital Infidelity: A Systematic Review and Meta-analysis. Heliyon, 10(1), e23261. DOI: 10.1016/j.heliyon.2023.e23261.
২. Haseli, A. et al. (2019). Infidelity and Its Associated Factors: A Systematic Review. The Journal of Sexual Medicine, 16(8), 1155–1169. DOI: 10.1016/j.jsxm.2019.04.011.
৩. Fincham, F. D. and May, R. W. (2017). Infidelity in Romantic Relationships. Current Opinion in Psychology, 13, 70–74. DOI: 10.1016/j.copsyc.2016.03.008.
৪. Selterman, D., Garcia, J. R. and Tsapelas, I. (2019). Motivations for Extradyadic Infidelity Revisited. The Journal of Sex Research, 56(3), 273–286. DOI: 10.1080/00224499.2017.1393494.
৫. Allen, E. S. et al. (2011). Infidelity in Heterosexual Couples: Demographic, Interpersonal, and Personality-Related Predictors of Extradyadic Sex. Archives of Sexual Behavior. PMID: 21667234.
গবেষণার সীমাবদ্ধতা: প্রকাশিত গবেষণার একটি বড় অংশ পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য, স্বপ্রতিবেদন এবং পশ্চিমা দেশ বা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক অংশগ্রহণকারীদের উপর নির্ভরশীল। কোনও দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেই একটিকে অন্যটির নিশ্চিত কারণ বলা যায় না। তাই এই ফলাফল ভারতের প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য, এমন দাবি করা যাবে না।

















