Monday, September 21, 2026
WA
Home Bangla কালের সাক্ষী কান্তজীর মন্দির ,মানবসুষ্ট দর্শনীয় দিঘী, লিচুর রাজ্য মায়াবী স্বপ্নময়,ভুবন...

কালের সাক্ষী কান্তজীর মন্দির ,মানবসুষ্ট দর্শনীয় দিঘী, লিচুর রাজ্য মায়াবী স্বপ্নময়,ভুবন স্বপ্নপুরী এ সবই দিনাজপুরে

0
1687
Kantaji Temple Bangladesh
Kantaji Temple Bangladesh

কালের সাক্ষী কান্তজীর মন্দির মানবসুষ্ট দর্শনীয় দিঘী লিচুর রাজ্য মায়াবী স্বপ্নময় ভুবন স্বপ্নপুরী এ সবই দিনাজপুরে

লোকমান হোসেন পলা

দিনাজপুর ভ্রমণপিয়াসীদের এক স্বর্গরাজ্য। এখানে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। আর লিচুর সিজনে বোনাস হলো বিশাল সব লিচুবাগানে বসে লিচুর সৌন্দর্য দেখা। লিচুর সিজন আসলে খুব কম। বড়জোর এক থেকে দেড় মাস। মে থেকে হয়তো জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত লিচু পাওয়া যাবে। আর তাই সময় পেলে এখনই ঘুরে আসুন লিচুর রাজ্য দিনাজপুর। সঙ্গে দেখবেন রামসাগর, কান্তজির মন্দির, স্বপ্নপুরী, নয়াবাদ মসজিদসহ অন্যান্য সব স্থাপনা।

কান্তজীর মন্দিরঃ
বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর মন্দির । শুধু বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য কীর্তির অসাধারণ এক নিদর্শন এই মন্দির। দিনাজ পুরের টেপা নদীর ওপারে কান্তনগর গ্রামে এর অবস্থান। এই মন্দিরেরর নির্মাতা হিসেবে সাধারণ মানুষ রাজা রামনাথকে জানলেও প্রকৃতপক্ষে মন্দিরের সূচনাকারী ছিলেন প্রাচীন দিনাজপুরের জমিদার রামনাথের বাবা মহারাজ প্রাণনাথ রায়। মৃত্যুজনিত কারণে প্রাণনাথ নির্মাণ কাজ শেষ করে যেতে পারেননি, মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে রাজা রামনাথ নির্মাণকার্য সমাধা করেন; কাজ শেষ হয় ১৭৫২ সালে।

কথিত আছে, মন্দিরটি নির্মাণ করতে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছিলো। দিনাজপুর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে ঝলমলে এ মন্দিরে যিনিই একবার গিয়েছেন তিনিই বাঁধা পড়ে গেছেন এর অনন্য সৌন্দর্যজালে! শান্ত, নির্জন, নিরিবিলি পরিবেশে নির্মিত এ মন্দিরের দরজাগুলো কাঠের। দেখতে অনেকটা রথের মতো, ইট ও পাথরের কণা দিয়ে নির্মিত কান্তজীর মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা আছে ছোট ছোট ভাস্কর্যের প্রতিচ্ছবি- দেয়ালে নৃত্যরতা রমনী, গায়ক, দেবতা, শিকারি, দেবতা, নৌকার মাঝি, নারী, পুরুষ, কিন্নর, যোদ্ধা, গায়ক, গৃহিণী, পালকি বাহকসহ আরো অনেক কিছু।

বিচিত্র মূর্তিখচিত এ দেয়ালে রয়েছে রামায়ণ মহাভারতের অনেক কাহিনী। শ্রীকৃষ্ণ এবং পৌরাণিক কাহিনী তো আছেই। প্রতি বছর রাসপূর্ণিমার রাতে উদযাপিত হয় রাসলীলা । জানা যায়, ৫২ বর্গফুটের এই মন্দিরের উচ্চতা ৭০ ফুট। মাঝখানে অবস্থিত মন্দিরের আয়তন ২৭০৪ বর্গফুট। মন্দিরের দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে রয়েছে নয়াবাদ মসজিদ। ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত মসজিদটির শিল্পচাতুর্য এবং অনুপম নির্মান খুব সহজেই মানুষের মন কেড়ে নেয়।

মন্দির ঘুরে ফেরার পথে চেহেল গাজীর মাজার। এ মাজারে রয়েছে ৪০ জন বীরযোদ্ধার সমাধিসৌধ। মাজারের কাছে ঐতিহাসিক ছোট একটি মসজিদ। পশ্চিমদিকে অবস্থিত মসজিদটির সিংহভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। ধারণা করা হয় এটি নির্মিত হয়েছিলো ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে। মাজারের ২০০ গজ উত্তরে এক একর আয়তন বিশিষ্ট একটি ঢিবি রয়েছে। এই ঢিবিতে প্রচুর ইট পাওয়া যায়। সম্ভবত এটি হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের কোনো মন্দিরের ভগ্নাংশ।

রামসাগরঃ
দিনাজপুর সদর উপজেলার তাজপুর গ্রামে সদর থেকে আট কিঃ মিঃ দুরে।
দীঘিটি খনন করা হয় ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ সময়কালে।
১৯৬০ সালে রামসাগরকে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আনা হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে রামসাগরকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল রামসাগরকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
রামসাগর মানুষের খনন করা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দিঘি। পাড়সহ রামসাগরের আয়তন ৪,৩৭,৪৯২ বর্গমিটার, দিঘির দৈর্ঘ্য ১,০৩১ মিটার ও প্রস্থ ৩৬৪ মিটার। রামসাগর দিঘির গভীরতা গড়ে প্রায় ১০ মিটার। দিঘির পশ্চিম পাড়ে মধ্যখানে একটি সুবিশাল ও মনোরম ঘাট ছিল যার কিছু অবশিষ্ট এখনো রয়েছে। বিভিন্ন আকৃতির বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত ঘাটটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৪৫.৮ মিটার ও ১৮.৩ মিটার।

রামসাগর দিঘি নিয়ে প্রচলিত রয়েছে লোককাহিনী। এই অঞ্চলে প্রাণনাথ নামে এক রাজা ছিলেন। সুশাসক ও প্রজাপ্রিয় রাজা বলে তাঁর দেশজোড়া খ্যাতি ছিল, আর ছিল অফুরন্ত ধনসম্পদ। তৎকালে দেশজুড়ে নেমে আসে প্রকৃতির নিষ্ঠুর তাণ্ডব। শুরু হয় একটানা অনাবৃষ্টি ও খরা। গোটা মৌসুমে একফোঁটা পানিও পড়ল না আকাশ থেকে। অনাবাদি রইল মাঠ। ফসল বা শস্য পাওয়া গেল না একমুঠো। দেশজুড়ে দেখা দিল প্রচণ্ড খাদ্যাভাব। অনাহারে মরে শত শত মানুষ। জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হলো রাজভাণ্ডার। এতে খাদ্য সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও দেখা দিল পানীয়জলের অভাব। দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টি ও খরায় খাল-বিল, দিঘি-নালা শুকিয়ে খাঁ খাঁ। একফোঁটা পানি নেই কোথাও। রাজ্যজুড়ে শুরু হলো পানির জন্য আহাজারি।এমন পরিস্থিতিতে রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন এক বিরাট দীঘি খনন করার। শুরু হলো দিঘি খনন। হাজার হাজার শ্রমিক দিনরাত পরিশ্রম করে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে খনন করে এক বিশাল দিঘি। কিন্তু এত গভীর করে খনন করা সত্ত্বেও দীঘির বুকে এলো না একফোঁটা পানি। হতাশা ও দুর্ভাবনায় বৃদ্ধ রাজা আহার-নিদ্রা ত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যুর আশঙ্কায় ঘরে ঘরে শুরু হলো কান্নার রোল।
একদিন রাজা স্বপ্নে দৈববাণী পেলেন, তাঁর একমাত্র পুত্র রামকে দিঘিতে বলি দিলেই পানি উঠবে। রাজার মুখে স্বপ্নাদেশ শুনে সারা রাজ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। কিন্তু রাজপুত্র রামের মনে কোনো বিকার নেই। নিজের প্রাণের বিনিময়ে প্রজাদের জীবন রক্ষা করতে রাজকুমার অবিচল। রাজার নির্দেশক্রমে দিঘির মধ্যস্থলে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করা হলো। এরপর গ্রামে গ্রামে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে প্রজাদের জানিয়ে দেওয়া হলো, কাল ভোরে দিঘির বুকে পানি উঠবে।

পরদিন ভোর না হতেই রাজবাড়ির সিংহদ্বার খুলে গেল। বেজে উঠল কাড়া-নাকাড়া। হাতির পিঠে চড়ে সাদা কাপড় পরে যুবরাজ যাত্রা শুরু করলেন সেই দিঘির দিকে। যুবরাজ রাম সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন মন্দিরে। সঙ্গে সঙ্গে দিঘির তলদেশ হতে অজস্র ধারায় পানি উঠতে লাগল। চোখের পলকে পানিতে ভরে গেল বিশাল দিঘি। পানিতে ভেসে রইল রাজকুমারের সোনার মুকুট। যুবরাজ রামের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে দিঘির নাম রাখা হলো রামসাগর।
আরো একটা লোককাহিনী শোনা যায়। রাজা রামনাথের দিঘি খনন করার পর পানি না উঠলে রাজা স্বপ্ন দেখেন দিঘিতে কেউ প্রাণ বিসর্জন করলে পানি উঠবে। তখন স্থানীয় রাম নামের এক যুবক দিঘিতে প্রাণ বিসর্জন দিলে রাজার নির্দেশেই সেই যুবকের নামে দিঘির নাম রাখা হয় রামসাগর।

স্বপ্নপুরীঃ
স্বপ্ন নয়, অথচ স্বপ্নের মতো নির্মল নিরিবিলি এক মায়াবী স্বপ্নময় ভুবন স্বপ্নপুরী,
এখানে রয়েছে কৃত্রিম হ্রদ, পাহাড়, লেক, উদ্যান, বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছগাছালি ও ফুলের সমারোহ, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা, কৃত্রিম পশুপাখি, ফুলবাগিচা, ইটখোলা, কৃত্রিম ঝর্ণা, ঘোড়ার রথ, হংসরাজ সাম্পান, শালবাগান, খেলামঞ্চ, নামাজঘর। কুঞ্জ, ভাস্কর্য, ডাকবাংলো, মাটির কুটির, বাজার প্রকৃতিতে বাংলাদেশের মানচিত্র। যেন এক মোহন-মায়াবী স্বপ্নিল ভুবন। কয়েক ভাগে বিভক্ত করা এই স্বপ্নময় জগতের পথ চলতে চলতে দেখা যায়, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা ঘাড়গুঁজো বসে থাকা অবসন্ন কৃষকের ভাস্কর্য। সেখানে সারিবদ্ধ চেয়ার, টুল বসানো আছে। হংসরাজ সাম্পানে চড়ে স্বচ্ছ নীল পানির লেকে হারিয়ে যাবেন কিছুণের জন্য স্বপ্নের জগতে। সাম্পানে যেতে যেতে দেখা যাবে কোথাও একাকী দাঁঁড়িয়ে আছে নারী, মাথা নিচু করে বসে আছে হতাশাগ্রস্ত যুবক অথবা ফুটে আছে বিশালকৃতি কচুপাতা। এছাড়াও রয়েছে কৃত্রিম পশু দুনিয়া। প্রবেশ পথে দুটি ড্রাগন সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। দেয়ালে চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিলুপ্তপ্রায় হিংস্র প্রাণীদের প্রতিকৃতি। এরপর দু’এক পা ফেলতেই চমকে উঠবেন; সামনেই পথ জুড়ে হাঁ করা এক নর-করোটি দেখে! এই নর-করোটির মুখের ভেতর দিয়েই মূল পশু দুনিয়ায় পৌঁছতে হবে। এছাড়াও এখানে রয়েছে, কৃত্রিম পাহাড় ও ঝর্ণা। ঝর্ণার পানি গড়িয়ে একটি ছোট জলাশয়ে পড়ছে। লেকের পাশে রয়েছে ২৫০০ বর্গফুট বিস্তৃত বাংলাদেশের মানচিত্র, যা ইট-সিমেন্ট দিয়ে সুন্দরভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জের খালিশপুর মৌজায় প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই দৃষ্টিনন্দন পিকনিক বা বিনোদন স্পট স্বপ্নপুরী স্বপ্নপুরীর অবস্থান দিনাজপুর জেলা শহর থেকে সড়ক পথে ৩৩ মাইল বা ৫২ কিলোমিটার দণি-পূর্বে জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিশপুর মৌজায়।

কীভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে হানিফ শ্যামলী, নাবিল, কেয়া পরিবহনের বিভিন্ন বাস সকাল-সন্ধ্যা দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। বাসে সময় কম লাগে। কিন্তু আরাম করে যেতে চাইলে ট্রেনে চেপে দিনাজপুর যাওয়া সব চেয়ে ভালো। সময় লাগবে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মতো। সকালে একতা এক্সপ্রেস আর রাতে দ্রুতযান এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে দিনাজপুর ছেড়ে যায় প্রতিদিন।

কোথায় থাকবেন : দিনাজপুর শহরে রাত যাপনের জন্য ভালো হোটেল আছে। হোটেল দিনার, হোটেল আল-রশিদ এসব হোটেলের মধ্যে অন্যতম। তাছাড়া আপনি চাইলে হাউজিং মোড়ে পর্যটন মোটেলে রাত্রি যাপন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আপনাকে আগে থেকেই বুকিং দিয়ে যেতে হবে। খাবারের জন্য হোটেল রয়েছে প্রচুর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Adblocker detected! Please consider reading this notice.

We've detected that you are using AdBlock Plus or some other adblocking software which is preventing the page from fully loading.

We don't have any banner, Flash, animation, obnoxious sound, or popup ad. We do not implement these annoying types of ads!

We need money to operate the site, and almost all of it comes from our online advertising.

Please add https://www.ibgnews.com to your ad blocking whitelist or disable your adblocking software.

×
Verified by MonsterInsights