নারী বন্দিদের কণ্ঠস্বর ও মানবিক অনুসন্ধান
সুরাজ পাল
সমাজের বিস্মৃত, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা তাঁরা। লোকচক্ষুর আড়ালে, কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে জীবন কাটে। আমরা তাঁদের ‘বন্দি’ বা ‘কয়েদি’ বলে দাগিয়ে দিই। কিন্তু ভুলে যাই, এই পরিচয়ের আড়ালেও তাঁরা নারী, মা, কন্যা কিংবা বোন। ভারতীয় কারাগারগুলির বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল। সাম্প্রতিক ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো ২০২৩-এর পরিসংখ্যান বলছে, কারাগারগুলিতে ভিড় উপচে পড়ছে। গড় দখলদারিত্বের হার ১২০.৮ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বন্দিদের প্রায় ৭৩.৫ শতাংশ বিচারাধীন, অর্থাৎ তাঁদের অপরাধ এখনও প্রমাণিত হয়নি। আবার, বিশাল সংখ্যক বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই নারী। এই নারীরা প্রায়শই ‘ত্রিমুখী প্রান্তিককরণের’ শিকার। প্রথমত, নারী হিসেবে; দ্বিতীয়ত, দরিদ্র বা প্রান্তিক শ্রেণি থেকে আগত হিসেবে এবং তৃতীয়ত, ‘বন্দি’ তকমাধারী হিসেবে। পশ্চিমবঙ্গও চিত্রের বাইরে নয়। ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ১৪৭ জন নারী বন্দি তাঁদের ১৯২ জন সন্তানকে নিয়ে কারাগারে দিন কাটাচ্ছিলেন, যা সারা দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা। এই সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী? নারীদের মুক্তির পর তাঁদের জীবন কোন খাতে বইবে? সমাজ কি তাঁদের গ্রহণ করবে? এরকম জ্বলন্ত এবং জরুরি প্রশ্নগুলিরই উত্তর খোঁজার সাহসী ও সহানুভূতিশীল প্রচেষ্টা করেছেন মৃদুলা বিশ্বাস তাঁর ‘এডুকেশন অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন ইন প্রিজন’ গ্রন্থে।
তাঁর গবেষণাটি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার দুটি সংশোধনাগার, যথা বহরমপুর এবং লালবাগ-এর ১৪৩ জন নারী বন্দির জীবনের ওপর আধারিত। লেখিকা শুধু শুকনো পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করেননি। নির্দিষ্ট এলাকা বা বিষয়কে আতশকাচের নীচে রেখে গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছেন। বন্দিদের মনের কথা বের করার জন্য কেবল ধরাবাঁধা প্রশ্ন করেননি, বরং তাঁদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতায় মেতেছেন। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাঁদের জীবন। বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক বন্দিদের শিক্ষার প্রবল ইচ্ছে এবং ব্যবস্থার মর্মান্তিক ব্যর্থতাকে তুলে ধরা। লেখিকা দেখিয়েছেন, বন্দি নারীরা অন্ধকার জগতে হারিয়ে যেতে চান না। তাঁদের মধ্যে শিক্ষা ও আত্মবিকাশের তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি তাঁদের জবানবন্দিগুলিকে নয়টি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— প্রথাগত শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার তাগিদ, ন্যূনতম সাক্ষরতা অর্জনের চেষ্টা, সামাজিক কলঙ্ক মুছে ফেলার জেদ এবং একজন ভালো মা ও রোল মডেল হয়ে ওঠার বাসনা।
বইটিতে উদ্ধৃত কিছু জবানবন্দি মনকে নাড়িয়ে দেয়। যেমন, ২৯ নম্বর বন্দি বলছেন, “আমি ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাইনি। আমি মনে করি শিক্ষা আমাকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দিতে পারে। আমার অতীতের ভুলগুলো শোধরাতে পারে। আমি প্রাথমিক পড়া ও লেখা শিখতে চাই।” আবার ২১ নম্বর বন্দি, যিনি একজন মা, তার লক্ষ্য স্পষ্ট। তিনি বলছেন, “আমি আমার সময়টাকে কাজে লাগাতে চাই। এমন কাজ শিখতে চাই যা আমাকে মুক্তির পর চাকরি পেতে সাহায্য করবে। আমি চাই আমার সন্তানরা আমাকে নিয়ে গর্বিত হোক এবং ভালো জীবনের সুযোগ পাক।” তীব্র আকাঙ্ক্ষার উলটো পিঠেই রয়েছে মর্মান্তিক বাস্তবতা। লেখিকা দেখিয়েছেন, সংশোধনাগারের বর্তমান শিক্ষাগত উদ্যোগগুলো কীভাবে ক্ষমতায়নের পরিবর্তে হতাশা তৈরি করছে। তথ্যে দেখা যাচ্ছে, জেলের ভেতরের শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর বন্দিদের আত্মমর্যাদাবোধ উলটে গড়ে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। মাত্র ১৫ শতাংশ নারী আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির কথা বলেছেন। ২৫ শতাংশ বন্দি মনে করেন তাঁদের কোনও উল্লেখযোগ্য দক্ষতাই বাড়েনি। মাত্র ১০ শতাংশ নতুন কিছু শিখতে পেরেছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য, আইনি অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তাঁদের সচেতনতা ৪৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
নেতিবাচক ফলাফলের কারণ কী? বন্দিদের এত আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা ব্যর্থ কেন? বইটি ‘কেন’-এর উত্তরও অনুসন্ধান করেছে। লেখিকা এখানে মূল কাঠামোগত বাধাগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যর্থতার জন্য বন্দিরা দায়ী নন। দায়ী সেই ব্যবস্থা যা তাঁদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তথ্যে উঠে এসেছে, প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অর্ধেকেরও কম পদ পূরণ করা আছে। কাজের সময়ের সঙ্গে ক্লাসের সময় মেলে না, তাই অধিকাংশ বন্দি অংশ নিতে পারেন না। প্রায় ৫০ শতাংশ বন্দি জানতেনই না তাঁদের জন্য কী কী সুযোগ রয়েছে। মাত্র ১৫ শতাংশ প্রোগ্রামে বিশেষায়িত কাজ (যেমন কম্পিউটার বা উন্নতমানের সেলাই) শেখানো হয়। ৮০ শতাংশ বন্দি সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে তীব্র মানসিক চাপে ভোগেন, যা তাদের শেখার ইচ্ছাকে দমিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতেও যেটুকু ইতিবাচক উদ্যোগ চলছে, তারও খণ্ডচিত্র বইটিতে আছে। লেখিকা তুলে ধরেছেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওপেন স্কুলিং বা নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়-এর মতো মুক্ত শিক্ষার সুবিধা কিছু বন্দি নিচ্ছেন। কারাগারে অঙ্গনওয়াড়ি সুবিধাও (২১.৭ শতাংশ ব্যবহার করেন) রয়েছে, যা মা ও শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লেখিকা বিভিন্ন এনজিও ও সরকারি প্রকল্পের ভূমিকাও বিশ্লেষণ করেছেন। ডন বস্কো, রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম ইত্যাদি সংস্থাগুলি এবং রাজ্য সরকারের উৎকর্ষ বাংলা বা স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প কাজ করছে। যদিও তথ্য বলছে, উদ্যোগগুলির বেশিরভাগই বিনোদনমূলক (যেমন নাটক কর্মশালা ৩১.৪৭ শতাংশ, নৃত্য শিক্ষা ২৬.৫৭ শতাংশ)। রোজগারের পথ দেখাবে এমন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ খুব কম। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি বন্দিদের ‘ক্ষমতায়ন’ করছি, নাকি কেবল তাদের ‘মন ভোলানোর’ চেষ্টা করছি?
লেখিকা অস্বস্তিকর সত্যকে প্রকাশ করতে ভয় পাননি। যেখানে বেশিরভাগ গবেষণাপত্র সাফল্যের খতিয়ান দেয়, সেখানে তিনি ব্যর্থতার কারণগুলোকে নির্মমভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তথ্য যাচাইয়ের জন্য বহুমুখী পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ সাক্ষাৎকার, পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি খাতা থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখেছেন। এতে গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। তবে, বইটি নিছক তাত্ত্বিক নয়। তথ্য ও মানবিক গল্পের অনবদ্য মিশ্রণ। একদিকে যেমন শতাংশের হিসাব আছে, অন্যদিকে তেমনই আছে বন্দিদের নিজেদের গলায় বলা যন্ত্রণার কথা। এই মানবিক আবেদনই বইটিকে শুষ্ক গবেষণাপত্র থেকে সামাজিক দলিলে রূপান্তরিত করেছে।
যে-কোনও ভালো গবেষণার মতোই, বইটিও তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। স্বয়ং লেখিকা অত্যন্ত সততার সঙ্গে সীমাবদ্ধতাগুলি উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, এটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমীক্ষা এবং মুর্শিদাবাদ জেলার দুটি সংশোধনাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই ফলাফল সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের চিত্র না-ও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, গবেষণাটি নির্দিষ্ট সময়ের ছবি তুলে ধরে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা নয়। ফলে মুক্তির পর শিক্ষার প্রভাব কতটা পড়ল, তা জানা সম্ভব হয়নি। তৃতীয়ত, এটি মূলত গুণগত গবেষণা, যা বন্দিদের গভীর অনুভূতিকে ধরতে পারে কিন্তু সংখ্যাগতভাবে সাধারণীকরণ করা কঠিন। তবে, সীমাবদ্ধতাগুলো বইটির গুরুত্ব কমায় না, বরং লেখিকার অ্যাকাডেমিক সততাকে প্রমাণ করে এবং ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য নতুন দিকনির্দেশিকা তৈরি করে।
‘এডুকেশন অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন ইন প্রিজন’ কেবল সমাজকর্মী বা গবেষকদের জন্য নয়, নীতিনির্ধারক, পুলিশ-প্রশাসন এবং সাধারণ পাঠকের জন্যেও অবশ্যপাঠ্য। লেখিকা তার গবেষণার মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক নারীদের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরেছেন। বইটি শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেই থেমে থাকেনি, অচলায়তন ভাঙার পথও বাতলে দিয়েছে। শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ, নমনীয় ক্লাসের সময়সূচি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আধুনিকীকরণ এবং মুক্তির পর সহায়তা জোরদার করার মতো পরামর্শগুলো বইটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। লেখিকা শেষে নেলসন ম্যান্ডেলার সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করেছেন, “শিক্ষাই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা দিয়ে পৃথিবীকে পরিবর্তন করা যায়।” বইটি প্রমাণ করে, সেই পরিবর্তন কারাগারের দেওয়ালের ভিতর থেকেও শুরু হতে পারে। বন্দি নারীরা হার মানেননি, তাঁরা শুধু একটি সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। বইটি সেই সুযোগটি তৈরি করার জন্য আমাদের সকলকে, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানায়। নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোচনায় গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে অমূল্য সংযোজন।
এডুকেশন অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন ইন প্রিজন
ড. মৃদুলা বিশ্বাস।
প্রথম প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫।
প্রকাশক: উদার আকাশ।
ঠিকানা: ঘটকপুকুর, ভাঙড় গোবিন্দপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। মূল্য: ২৫০ টাকা।
যোগাযোগ: ৭০০৩৮২১২৯৮।

















