রাঁচিতে ডুরান্ড কাপের ঐতিহাসিক সূচনা, ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপ ট্রফি সফরে উৎসবের আবহ
ঝাড়খণ্ডের রাজধানী প্রথমবারের মতো পাচ্ছে এশিয়ার প্রাচীনতম ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের গৌরব
অন্তরা ত্রিপাঠী | আইবিজি নিউজ
রাঁচি, ১৯ জুলাই: ভারতের প্রাচীনতম এবং বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীনতম জীবিত ফুটবল প্রতিযোগিতা ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপ-এর ট্রফি সফর শনিবার রাঁচিতে পৌঁছতেই উৎসবের আবহে মেতে উঠল ঝাড়খণ্ডের রাজধানী। প্রথমবারের মতো ডুরান্ড কাপ-এর আয়োজক শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে রাঁচি, যা রাজ্যের ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কমান্ডের উদ্যোগে দিপাটোলি মিলিটারি স্টেশনের কেরকেট্টা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঝাড়খণ্ড সরকারের পর্যটন, শিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক মন্ত্রী সুদিব্য কুমার, রাঁচির জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল সজ্জন সিং মান, রাজ্য সরকারের ক্রীড়া দপ্তরের ঊর্ধ্বতন আধিকারিক, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিরা, বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবের সদস্য এবং বিপুল সংখ্যক ক্রীড়াপ্রেমী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী সুদিব্য কুমার বলেন, রাঁচির জন্য এটি অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত। ভারতের সেরা ফুটবল ক্লাবগুলির পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক দলও এবার রাঁচিতে খেলবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ফুটবলপ্রেমীরা একটি উচ্চমানের প্রতিযোগিতা উপভোগ করবেন এবং এই টুর্নামেন্ট ঝাড়খণ্ডে ফুটবলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তুলবে। তিনি এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ঝাড়খণ্ড সরকার এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে ডুরান্ড কাপের ১৩৮ বছরের গৌরবময় ঐতিহ্য তুলে ধরা হয় একটি বিশেষ অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার মাধ্যমে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শন করা হয় টুর্নামেন্টের তিনটি ঐতিহাসিক ট্রফি—ডুরান্ড কাপ, প্রেসিডেন্টস কাপ এবং সিমলা ট্রফি। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঝাড়খণ্ডের ঐতিহ্যবাহী সাঁওতালি, ছৌ এবং ভাংড়া নৃত্য পরিবেশনা, যা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।
মেজর জেনারেল সজ্জন সিং মান বলেন, গত বছর জামশেদপুরে সফলভাবে ডুরান্ড কাপ আয়োজনের পর এবার রাঁচিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ঝাড়খণ্ডে ফুটবলের প্রসার আরও বাড়বে এবং বীরসা মুন্ডা ফুটবল স্টেডিয়াম দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ফুটবল প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় ট্রফি রোড শো। কোকর, লালপুর চৌক, করমটোলি রোড, কচেরি রোড এবং সুজাতা চৌকসহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে ট্রফিগুলি পুনরায় দিপাটোলি মিলিটারি স্টেশনে ফিরে আসে। পথে নিউক্লিয়াস মল, মোরাবাদী ময়দান এবং ফিরায়ালাল চৌকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সেনাবাহিনীর ব্যান্ড পরিবেশনা রোড শোকে এক জনউৎসবে পরিণত করে। হাজারো ফুটবলপ্রেমী তিনটি ঐতিহাসিক ট্রফি এক নজর দেখার জন্য রাস্তায় ভিড় জমান।
ডুরান্ড কাপ আয়োজক কমিটির নোডাল অফিসার কর্নেল অমিত কুমার যাদব জানান, রাঁচিতে প্রথমবারের মতো এই প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাঁচির মানুষ ডুরান্ড কাপকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করবেন এবং এই ঐতিহাসিক আসরকে স্মরণীয় করে তুলবেন।
ট্রফি সফরের পরবর্তী গন্তব্য গুমলা, যেখানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ট্রফিগুলিকে সংবর্ধনা জানানো হবে। এছাড়াও পরমবীর চক্র সম্মানপ্রাপ্ত শহীদ অ্যালবার্ট এক্কার মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ এবং বিভিন্ন জনসংযোগমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ঝাড়খণ্ড পর্বের সমাপ্তি ঘটবে।
এদিকে এখন নজর মাঠের লড়াইয়ে। গ্রুপ ‘সি’-এর সমস্ত ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে বীরসা মুন্ডা ফুটবল স্টেডিয়ামে। এই গ্রুপে রয়েছে জামশেদপুর এফসি, স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লি, ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স ফুটবল টিম এবং শ্রীলঙ্কা সশস্ত্র বাহিনীর ডিফেন্ডার্স এফসি।
রাঁচিতে প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ২৬ জুলাই, যেখানে মুখোমুখি হবে জামশেদপুর এফসি ও ডিফেন্ডার্স এফসি। এছাড়া ১৬ আগস্ট এখানে একটি কোয়ার্টার ফাইনালও অনুষ্ঠিত হবে।
২৫ জুলাই থেকে ২৩ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য ১৩৫তম ইন্ডিয়ানঅয়েল ডুরান্ড কাপ এবার আয়োজিত হবে কলকাতা, রাঁচি, গুয়াহাটি, শিলং এবং ইম্ফল—এই পাঁচটি শহরে। মোট ২৪টি দল ৪৩টি ম্যাচে অংশ নেবে। উদ্বোধনী ম্যাচে কলকাতা ডার্বিতে মুখোমুখি হবে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট ও ইস্টবেঙ্গল এফসি, আর ফাইনালও অনুষ্ঠিত হবে কলকাতার বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে।
আইবিজি নিউজ বিশ্লেষণ
রাঁচিকে ডুরান্ড কাপের নতুন আয়োজক শহর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা শুধু টুর্নামেন্টের ভৌগোলিক বিস্তার নয়, বরং ভারতের উদীয়মান ক্রীড়া কেন্দ্রগুলিতে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল পৌঁছে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। ঝাড়খণ্ড দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন খেলায় প্রতিভা তৈরি করে আসছে। ডুরান্ড কাপের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা রাঁচিতে আয়োজিত হওয়ায় রাজ্যের ক্রীড়া অবকাঠামো, পর্যটন, যুবসমাজের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ এবং স্থানীয় ফুটবলের বিকাশ নতুন গতি পাবে।
আজ ডুরান্ড কাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; এটি ভারতীয় সেনাবাহিনী, রাজ্য সরকার এবং ভারতীয় ফুটবলের গৌরবময় ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনমঞ্চ। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের নতুন ক্রীড়া কেন্দ্রগুলিতে এই প্রতিযোগিতার বিস্তার আগামী দিনের ফুটবল প্রতিভা গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতীয় সংহতি, ক্রীড়া সংস্কৃতি এবং যুবসমাজের অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করবে। রাঁচির আত্মপ্রকাশ সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যে এক নতুন ও গর্বের সংযোজন।
















