অনুপ্রবেশকারীদের ভোঁ-দৌড় ও বাংলাদেশের কুনাট্য
অমিত গোস্বামী
Kolkata,5 June 2026
ওমর আলি যখন অমর কালীঃ

সালটা ২০১৭। দিল্লি লাগোয়া ইন্দিরাপুরমে কন্যার বাস। ওর জন্যে নতুন জায়গা। ওকে থিতু করতে সেখানে কিছুদিনের জন্যে আমার অবস্থান। ওখানে সে’সময় রিকশ চলত। কন্যা তখনও গাড়ি কেনে নি। কাজেই রিকশ বাহন। অনভ্যাসে ওদের ডাকার সময় মুখ থেকে বেরিয়ে যেত, কী ভাই, যাবি? লক্ষ্য করলাম, প্রতি তিনজনকে প্রশ্ন করতেই একজন বলতো, হ্যাঁ, যাবো। এমন একজন রিকশওয়ালা, সত্যিকারের নাম ওমর আলি, নিজের পরিচয় দিয়েছিল অমর কালী বলে। বললাম, তুমি কাহালি? মানে ব্রাহ্মণ? সম্মতিসূচক মাথা নাড়তে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্রাহ্মণ যখন গায়ত্রী মন্ত্র বল তো। ব্যাস, ফেঁসে গেল। তারপরে প্রকাশ করল আসল কাহিনী। রাজশাহীর বাংলাদেশি। পেটের তাগিদে ইন্দিরাপুরমে সংসার পেতেছে। ওরা প্রায় ছয়শ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। জিজ্ঞাসা করলাম, সবাই হিন্দু পরিচয় দিচ্ছো কেন? উত্তর দিলো, তাদের স্ত্রী’রা ঘর-গৃহস্থালীর কাজ করে। হিন্দুরা সম্পন্ন ও গোঁড়া। তারা মুসলমান জানলে কাজে নেবে না। তাই। ওমরের সাথে বেশ সখ্যতা হল। দেখলাম যে কায়িক শ্রমে তাদের আয় ভালো। সংসার মসৃনভাবে চলছে।
কোভিডে হাওয়াঃ
২০২০ সালের ১৭ অগাস্ট। কোভিডের প্রথম লকডাউন উঠতেই কলকাতা থেকে দিল্লিগামী প্রথম ফ্লাইটে প্রচুর ধড়াচূড়া পরে কন্যার বাসায় পৌঁছলাম। রাস্তায় রিকশ বা গাড়ি চলছে না। ওমরদের ঝুপড়ি চিনতাম। সেখানে খুব ভালো ছোটমাছ পাওয়া যেত। সুন্দর করে কেটেকুটে দিত। একদিন লোভী জিহ্বার চাহিদা মেটাতে কন্যার গাড়ি নিয়ে গেলাম সেই ঝুপড়ি অঞ্চলে। দেখলাম প্রায় কেউ কোত্থাও নেই। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, মানুষজন গেল কোথায়? সে বললো, যারা যেভাবে পেরেছে বাংলাদেশে চলে গেছে। কিছুজন পারে নি। তারা শুধু আছে। আয়-পয় নেই। তারাও ফেরার সুযোগ খুঁজছে।
কোভিড শেষে পঙ্গপালের ফের আগমনঃ
এবারে অর্থাৎ ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারির শেষে আবার উপস্থিত হলাম ইন্দিরাপুরমে। দেখলাম পঙ্গপালের মত নতুন অনেকে এসেছে। বিশেষত নির্মাণ শ্রমিকের কাজ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিরাই করছে। কিন্তু পহেলগাঁও কান্ডের পরে ভারত-পাক সংঘাতের সময় শুনলাম, সেই বস্তির প্রায় সবাইকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। দেশে ফেরত পাঠাবে। আমার বর্তমান মাছওয়ালা আলিপুরদুয়ারের পরেশ বলল, এদের না’হয় দেশ থেকে ভাগালো। সবাইকে কি ভাগাতে পেরেছে? গুজরাট, রাজস্থানে ওরা পিলপিল করছে। আর আমাদের রাজ্যে যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা গেঁড়ে বসে আছে তাদের কী হবে! ইঙ্গিত স্পষ্ট।
অনুপ্রবেশ মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারনঃ
পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যা ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ২৭ শতাংশ ছিল। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারির হিসাব অনুসারে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় রাজ্যে মোট ভোটার ছিল ৭ কোটি ৬৩ লক্ষ ৯৬ হাজার ১৬৫ জন। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘নিউজ ১৮’ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৫ সালে ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশের মতো মুসলিম জনসংখ্যা হতে পারে বাংলায়। ইতিহাসের দিকে তাকালে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১২ শতাংশের আশেপাশে। ক্রমে ৩৩ শতাংশ। এর কারন কখনই ভারতীয় মুসলমানদের জন্মহার নয় কারণ ভারতীয়দের মধ্যে সব সম্প্রদায়ের জন্মহারের পার্থক্য প্রায় একই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী মুসলমানদের গেঁড়ে বসা মানুষদের জন্যে সেই সম্প্রদায়ের শতাংশের এতটা বৃদ্ধি।
‘ভারত কোনও ধর্মশালা নয়ঃ
‘ভারত কোনও ধর্মশালা নয়। গোটা বিশ্বের উদ্বাস্তুদের এখানে আশ্রয় দেওয়া যায় না।’ বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ ২০২৫ সালে এই মন্তব্য করেছেন। ভারতের গৃহ মন্ত্রক (Ministry of Home Affairs) একটি সার্কুলার জারি করে যার প্রতিলিপি রাজ্যপুলিশের ডিজি ও বিএসএফ-এর ডিজিকে পাঠিয়ে বলেছেন যে অতি দ্রুত সারা ভারতের সকল বাংলাদেশ ও মায়ানামার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নিজেদের ভারতীয় বলে দাবী করে এদেশে বসবাস করছে, তাদের চিহ্নিত করে নিজদেশে ফেরৎ পাঠাতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ অনুপ্রবেশ একটি গুরুতর অপরাধ। এই অনুপ্রবেশকারীদের ফিরিয়ে নেওয়ার দায় অনুপ্রবেশকারীর দেশের। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার এই অনুপ্রবেশকারীদের ফিরিয়ে নিতে টালবাহানা করে আসছে। প্রত্যাবাসন অসম্ভব যখন তখন উপায় কী! অতএব ‘পুশ ব্যাক’।
পশ্চিমবঙ্গে সূর্যোদয়ের পর আঁধার নামল অনুপ্রবেশকারীদেরঃ
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালে যাদের অনুপ্রেরনায় অগনিত বাংলাদেশি ভারতে এসেছিল, সকল সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছিল, শাসকের ভোটব্যাঙ্ক হয়ে উঠেছিল, তারা ভোটে নিশ্চিহ্ন হতেই কপাল পুড়ল বাংলাদেশিদের। ক্ষমতায় এক বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নির্দেশ জারি করলেন যে অনুপ্রবেশকারীরা পালাও নাহলে ডিটেনশন সেন্টার। কিছু অনুপ্রবেশকারী ভোটের আগেই পালিয়েছিল এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশন কঠোর হওয়ায়। বাকীরা অপেক্ষা করছিল ভোটের ফলে আগের শাসকের জয়ের আশায়। কিন্তু এখন পালে পালে তারা চাইছেন সীমান্ত পেরোতে। বাধা দিচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীরা। গুচ্ছ গুচ্ছ প্রমাণ দেওয়ায় সত্ত্বেও নিজের দেশের নাগরিকদের দিকে বন্দুক তাক করে আছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে নো ম্যানস ল্যান্ডের ওপরে জনা কুড়ি বাংলাদেশি অপেক্ষা করছে কখন নিজের দেশে ঢুকতে পারে। বিজিবি বলছে তারা নাকি ভারতীয়। হাসি পাচ্ছে কারণ একজনও ভারতীয় মুসলমান বাংলাদেশের মত লাটপাট দেশে যাবেন না এপারের স্বর্গসুখ ছেড়ে। এই টালবাহানায় ক্ষতি হবে বাংলাদেশের । ব্যবসায়িক জটও খুলবে না আর গঙ্গা জল চুক্তির নবায়ণ হবে না। ভিসা প্রাপ্তি বিশ বাঁও জলে। এই হাজার দশেক সীমান্তে ভিড় করা বাংলাদেশিদের অবিলম্বে গ্রহণ করে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তারা ভালো জায়গায় থাক। তাতে সম্প্রীতি বাড়বে। এমনিতেও নিতে হবে অমনিতেও নিতে হবে, সেটা জানে বাংলাদেশ, তবে এই নাটক কেন?
















