এক ঘণ্টার অবরোধ, আজীবনের ক্ষতি: পূর্ব রেলের বার্তা – আন্দোলনে যেন থেমে না যায় মানুষের স্বপ্ন
By Antara Tripathy | IBG NEWS
কলকাতা | ১০ জুন, ২০২৬:
রেলপথে আন্দোলন বা অবরোধ অনেক সময় দাবি আদায়ের একটি প্রতিবাদী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, তার প্রভাব পড়ে হাজার হাজার সাধারণ যাত্রীর জীবনে। পূর্ব রেলের মতে, একটি স্বল্প সময়ের রেল অবরোধও কারও চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্নকে চিরতরে ভেঙে দিতে পারে।
এই বাস্তবতাকে তুলে ধরতে পূর্ব রেল একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনার উল্লেখ করেছে। কয়েক মাস আগে ২৪ বছর বয়সী এক তরুণী (নাম পরিবর্তিত—লীনা দাস) জীবনের প্রথম চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে শ্যামনগর থেকে শিয়ালদহের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, মাঝপথে রেল অবরোধের কারণে তাঁর ট্রেন তিন ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ে তিনি সাক্ষাৎকারস্থলে পৌঁছাতে পারেননি এবং চাকরির সুযোগ হারান। পূর্ব রেলের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
রেল সূত্রের দাবি, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরীক্ষা কেন্দ্র বা হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য ট্রেনের উপর নির্ভর করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন গুরুতর অসুস্থ রোগী, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীরা, চাকরিপ্রার্থীরা এবং নিত্যযাত্রী সাধারণ মানুষ। ফলে রেল পরিষেবা ব্যাহত হলে এর প্রভাব বহুমাত্রিক হয়।
গত এক বছরে একাধিক অবরোধ
পূর্ব রেলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে তাদের বিভিন্ন ডিভিশনে মোট ২৯টি রেল অবরোধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে—
- শিয়ালদহ ডিভিশন: ২২টি
- মালদা ডিভিশন: ৪টি
- হাওড়া ডিভিশন: ২টি
- আসানসোল ডিভিশন: ১টি
এছাড়া একই সময়ে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের ডাকা ২০টি সাধারণ ধর্মঘট সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে শিয়ালদহে ১২টি এবং হাওড়ায় ৮টি ছিল। মালদা এলাকায় একটি রাজনৈতিক দলের ডাকা একটি চাক্কা জ্যাম-এর ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
চলতি অর্থবর্ষেও পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি। এপ্রিল থেকে মে ২০২৬—মাত্র দুই মাসের মধ্যেই আরও দুটি রেল অবরোধের ঘটনা ঘটেছে, যার একটি শিয়ালদহ এবং অন্যটি হাওড়া ডিভিশনে।
বিকল্প পথেই দাবি জানানোর আহ্বান
পূর্ব রেলের বক্তব্য, যাত্রীদের সমস্যা ও দাবি শোনার জন্য প্রশাসন সবসময়ই প্রস্তুত এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষেই তারা বিশ্বাসী। তাই রেললাইন অবরোধের পরিবর্তে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি তুলে ধরার আবেদন জানানো হয়েছে।
আইনি অবস্থান
ভারতীয় রেলওয়ে আইন, ১৯৮৯-এর ধারা ১৭৪ অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রেন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ট্র্যাক অবরোধ, সিগন্যালিং ব্যবস্থার ক্ষতি বা ট্রেন চলাচল ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের জন্য দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
পূর্ব রেলের আবেদন
পূর্ব রেলের প্রধান জনসংযোগ আধিকারিক (CPRO) শিবরাম মাঝি বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ প্রতিটি যাত্রীকে পরিবারের সদস্যের মতোই গুরুত্ব দেয় এবং তাঁদের সমস্যার সমাধানে আলোচনার পথ সর্বদা খোলা। তাঁর কথায়, “এক ঘণ্টার অবরোধ কারও কাছে সামান্য প্রতিবাদ মনে হলেও, সেই সময়ের মধ্যেই হয়তো কোনও শিক্ষার্থী পরীক্ষা মিস করছে, কোনও রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিংবা কোনও চাকরিপ্রার্থী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারাচ্ছেন।”
তিনি সকলের কাছে আবেদন জানান, গণপরিবহন ব্যাহত করে এমন কর্মসূচি এড়িয়ে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হোক, যাতে সাধারণ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
















