ভারতের ১৮টি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অনন্য মডেল, UNESCO-র স্বীকৃতি পেয়েছে ১৩টি
লেখা: অন্তরা ত্রিপাঠী | IBG NEWS
নয়াদিল্লি, ২ নভেম্বর ২০২৬: জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ভারতের ১৮টি ঘোষিত জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল (Biosphere Reserves) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে ১৩টি অঞ্চল UNESCO-র World Network of Biosphere Reserves (WNBR)-এর অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।
আগামী ৩ নভেম্বর পালিত হবে আন্তর্জাতিক জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল দিবস (International Day for Biosphere Reserves)। হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য মরুভূমি থেকে পশ্চিমঘাটের চিরহরিৎ বন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য থেকে মান্নার উপসাগরের সামুদ্রিক পরিবেশ—ভারতের এই সংরক্ষিত অঞ্চলগুলি প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের সম্পর্ককে তুলে ধরে।
ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB) ২ নভেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত একটি তথ্যপত্রে দেশের জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলির বৈচিত্র্য, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সরকারি সহায়তা এবং সংরক্ষণমূলক উদ্যোগের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।
জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জীববৈচিত্র্য বলতে পৃথিবীর স্থলভাগ, জলভাগ ও সামুদ্রিক পরিবেশে বিদ্যমান জীবজগতের বৈচিত্র্যকে বোঝায়। Convention on Biological Diversity (CBD) অনুযায়ী জীববৈচিত্র্যের তিনটি প্রধান স্তর রয়েছে।
১. জিনগত বৈচিত্র্য: একই প্রজাতির মধ্যে জিনগত পার্থক্য, যেমন ধানের বিভিন্ন জাত।
২. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য: উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য জীবের বিভিন্ন প্রজাতি, যেমন বাঘ, হাতি ও অর্কিড।
৩. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য: বনভূমি, তৃণভূমি, জলাভূমি, প্রবালপ্রাচীরসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র।
জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলি এমনভাবে পরিকল্পিত হয়, যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়। এই অঞ্চলগুলি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা, খাদ্য ও জলনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং স্থানীয় জীবিকা সংরক্ষণে সহায়তা করে।
সাধারণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের তুলনায় জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত। এখানে প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থান এবং টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
UNESCO-র Man and the Biosphere Programme: তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য
১৯৭১ সালে UNESCO-র উদ্যোগে শুরু হয় Man and the Biosphere (MAB) Programme। এই কর্মসূচির অধীনে জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলিকে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক বোঝার এবং টেকসই উন্নয়নের কার্যকর পরীক্ষাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই কর্মসূচির তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো:
| প্রধান কাজ | উদ্দেশ্য |
|---|---|
| সংরক্ষণ (Conservation) | জীববৈচিত্র্য, জিনগত সম্পদ, বাস্তুতন্ত্র, প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা |
| টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development) | পরিবেশের সীমাবদ্ধতা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন |
| বৈজ্ঞানিক সহায়তা (Scientific Support) | গবেষণা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময় |
জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলের তিনটি স্তর
জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল সাধারণত তিনটি পৃথক ব্যবস্থাপনা অঞ্চলে বিভক্ত।
| অঞ্চল | প্রধান বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রম |
|---|---|
| কোর জোন (Core Zone) | কঠোরভাবে সংরক্ষিত এলাকা; জীববৈচিত্র্য, আবাসস্থল ও জিনগত সম্পদ রক্ষা |
| বাফার জোন (Buffer Zone) | বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পরিবেশ শিক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজম |
| ট্রানজিশন জোন (Transition Zone) | জনবসতি, টেকসই কৃষি, দায়িত্বশীল বনসম্পদ ব্যবহার, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড |
PIB-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলির গড় আয়তন বণ্টনে প্রায় ১৮ শতাংশ কোর জোন, ৩০ শতাংশ বাফার জোন এবং ৫২ শতাংশ ট্রানজিশন জোন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কাঠামোর মাধ্যমে কঠোর পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
ভারতের ১৮টি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল: সম্পূর্ণ তালিকা ও পরিসংখ্যান
ভারতে মোট ১৮টি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি UNESCO-র World Network of Biosphere Reserves-এর অন্তর্ভুক্ত।
সারণি ১: ভারতের ১৮টি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল
| ক্রম | সংরক্ষণ অঞ্চলের নাম | ঘোষণার বছর | UNESCO স্বীকৃতির বছর | রাজ্য/অঞ্চল | আয়তন (বর্গ কিমি) |
|---|---|---|---|---|---|
| ১ | নীলগিরি (Nilgiri) | ১৯৮৬ | ২০০০ | তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক | ৫,৫২০ |
| ২ | নন্দাদেবী (Nanda Devi) | ১৯৮৮ | ২০০৪ | উত্তরাখণ্ড | ৬,৪০৭.০৩ |
| ৩ | নোকরেক (Nokrek) | ১৯৮৮ | ২০০৯ | মেঘালয় | ৮২০ |
| ৪ | মান্নার উপসাগর (Gulf of Mannar) | ১৯৮৯ | ২০০১ | তামিলনাড়ু | ১০,৫০০ |
| ৫ | সুন্দরবন (Sundarbans) | ১৯৮৯ | ২০০১ | পশ্চিমবঙ্গ | ৯,৬৩০ |
| ৬ | মানস (Manas) | ১৯৮৯ | — | অসম | ২,৮৩৭ |
| ৭ | গ্রেট নিকোবর (Great Nicobar) | ১৯৮৯ | ২০১৩ | আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ | ৮৮৫ |
| ৮ | সিমলিপাল (Similipal) | ১৯৯৪ | ২০০৯ | ওড়িশা | ৫,৫৬৯ |
| ৯ | ডিব্রু-সাইখোয়া (Dibru-Saikhowa) | ১৯৯৭ | — | অসম | ৭৬৫ |
| ১০ | দিহাং-দিবাং (Dehang-Dibang) | ১৯৯৮ | — | অরুণাচল প্রদেশ | ৫,১১১.৫০ |
| ১১ | পাচমাড়ি (Pachmarhi) | ১৯৯৯ | ২০০৯ | মধ্যপ্রদেশ | ৪,৯৮১.৭২ |
| ১২ | কাঞ্চনজঙ্ঘা (Khangchendzonga) | ২০০০ | ২০১৮ | সিকিম | ২,৯৩১.১২ |
| ১৩ | অগস্ত্যমালাই (Agasthyamalai) | ২০০১ | ২০১৬ | কেরালা, তামিলনাড়ু | ৩,৫০০ |
| ১৪ | আচানকমার-অমরকণ্টক (Achanakmar-Amarkantak) | ২০০৫ | ২০১২ | মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় | ৩,৮৩৫.৪৬ |
| ১৫ | গ্রেট রান অব কচ্ছ (Great Rann of Kutch) | ২০০৮ | — | গুজরাট | ১২,৪৫৪ |
| ১৬ | কোল্ড ডেজার্ট (Cold Desert) | ২০০৯ | ২০২৫ | হিমাচল প্রদেশ | ৭,৭৭০ |
| ১৭ | শেষাচলম (Seshachalam) | ২০১০ | — | অন্ধ্রপ্রদেশ | ৪,৭৫৫.৫৮ |
| ১৮ | পান্না (Panna) | ২০১১ | ২০২০ | মধ্যপ্রদেশ | ২,৯৯৮.৯৮ |
দ্রষ্টব্য: মূল সরকারি তালিকায় UNESCO-র World Network-এ অন্তর্ভুক্তির বছর উল্লেখ করা হয়েছে। ড্যাশ (—) চিহ্নের অর্থ ওই তালিকায় স্বীকৃতির বছর দেওয়া নেই।
সারণি ২: ভারতের জীবমণ্ডল সংরক্ষণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
| সূচক | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| ভারতে ঘোষিত জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল | ১৮টি |
| UNESCO-র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অঞ্চল | ১৩টি |
| UNESCO তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয় এমন অঞ্চল | ৫টি |
| ভারতের প্রথম জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল | নীলগিরি, ১৯৮৬ |
| সর্বশেষ UNESCO স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অঞ্চল | কোল্ড ডেজার্ট, ২০২৫ |
| বৃহত্তম অঞ্চল | গ্রেট রান অব কচ্ছ, ১২,৪৫৪ বর্গ কিমি |
| ক্ষুদ্রতম অঞ্চল | ডিব্রু-সাইখোয়া, ৭৬৫ বর্গ কিমি |
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ভারতের জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলি ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক থেকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন, জলাভূমি, মরুভূমি, ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র।
UNESCO-র আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে ভারতের অবদান
UNESCO-র World Network of Biosphere Reserves বিভিন্ন দেশের সংরক্ষিত প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলির মধ্যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা, পরিবেশগত জ্ঞান বিনিময় এবং টেকসই উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে।
PIB-র প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, UNESCO-র আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে বর্তমানে ১৪৫টি দেশের মোট ৭৯৭টি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল রয়েছে। এই অঞ্চলগুলির মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ৩০ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হন।
বিশ্বের স্থলভাগের প্রায় ৫ শতাংশ এই নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে বিশ্বের স্থলজ মেরুদণ্ডী প্রাণীদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের ৬০ শতাংশেরও বেশি এই সংরক্ষণ অঞ্চলগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সারণি ৩: UNESCO-র বিশ্বব্যাপী জীবমণ্ডল সংরক্ষণ নেটওয়ার্ক
| সূচক | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| UNESCO-র জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল | ৭৯৭টি |
| অংশগ্রহণকারী দেশ | ১৪৫টি |
| প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত মানুষ | প্রায় ৩০ কোটি |
| পৃথিবীর স্থলভাগের আওতাভুক্ত অংশ | প্রায় ৫ শতাংশ |
| স্থলজ মেরুদণ্ডী প্রাণীর প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের অংশ | ৬০ শতাংশের বেশি |
| ২০৫০ সালের মধ্যে অধিক চরম জলবায়ু পরিস্থিতির ঝুঁকিতে থাকা সংরক্ষণ অঞ্চল | প্রায় ৪০ শতাংশ |
| অন্য আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ স্বীকৃতির সঙ্গে ওভারল্যাপ করা অঞ্চল | ৫০ শতাংশের বেশি |
এই পরিসংখ্যান জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ সহযোগিতার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
জীবমণ্ডল সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের ভূমিকা
ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (MoEFCC) জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করে। এর মধ্যে রয়েছে Biodiversity Conservation Scheme, যা বৃহত্তর Conservation of Natural Resources and Eco-systems কর্মসূচির অধীনে পরিচালিত হয়।
UNESCO-র Man and the Biosphere Programme-এর আওতায় থাকা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলির সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে রাজ্য সরকারগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। রাজ্যের বন দপ্তরগুলি অনুমোদিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে।
সারণি ৪: কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তার অনুপাত
| রাজ্যের শ্রেণি | কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ | রাজ্য সরকারের অংশ |
|---|---|---|
| অন্যান্য রাজ্য | ৬০ শতাংশ | ৪০ শতাংশ |
| উত্তর-পূর্ব ও হিমালয় অঞ্চলের রাজ্য | ৯০ শতাংশ | ১০ শতাংশ |
সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা
২০২২–২৩ অর্থবর্ষ থেকে চারটি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলে পাঁচ বছর মেয়াদি Integrated Management Plan পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে।
| সংরক্ষণ অঞ্চল | রাজ্য | প্রধান ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ |
|---|---|---|
| নন্দাদেবী | উত্তরাখণ্ড | আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, গবেষণা ও জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ |
| পাচমাড়ি | মধ্যপ্রদেশ | সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা ও টেকসই জীবিকা |
| দিহাং-দিবাং | অরুণাচল প্রদেশ | সংরক্ষণ পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ |
| অগস্ত্যমালাই | কেরালা ও তামিলনাড়ু | জনসম্পৃক্ততা, গবেষণা ও আবাসস্থল সংরক্ষণ |
এই পরিকল্পনাগুলিতে সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা হয়েছে। আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং স্থানীয় মানুষের টেকসই জীবিকার উন্নয়ন এর অন্যতম লক্ষ্য।
ভারতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল
১. নীলগিরি: পশ্চিমঘাটের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
১৯৮৬ সালে ঘোষিত নীলগিরি ভারতের প্রথম জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল। এটি তামিলনাড়ু, কেরালা ও কর্ণাটক—এই তিন রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত এবং পশ্চিমঘাটের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
এখানে চিরহরিৎ বন, পাহাড়ি শোলা বন এবং তৃণভূমি রয়েছে। এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বিপন্ন সিংহলেজ বানর (Lion-tailed Macaque), নীলগিরি তাহর, হাতি, বাঘ, গৌর, সাম্বার ও চিতল।
PIB-র তথ্য অনুযায়ী, এই সংরক্ষণ অঞ্চলে ১০০টিরও বেশি স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতি এবং ৫৫০টির বেশি পাখির প্রজাতি রয়েছে। শুধু নীলগিরি জেলাতেই ৬,০০০-এর বেশি উদ্ভিদ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়।
২. কোল্ড ডেজার্ট: হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য জীববৈচিত্র্য
হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত কোল্ড ডেজার্ট জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলের আয়তন ৭,৭৭০ বর্গ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৩,৩০০ থেকে ৬,৬০০ মিটার।
এই কঠিন পার্বত্য পরিবেশে ৭৩২টি ভাস্কুলার উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি স্থানীয় বা এন্ডেমিক প্রজাতি। তুষার চিতা, হিমালয়ান আইবেক্স এবং ব্লু শিপ এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী।
এই অঞ্চলে প্রায় ১২,০০০ মানুষের বসবাস। পশুপালন, ইয়াক ও ছাগল পালন, বার্লি ও মটরশুঁটির চাষ এবং তিব্বতি ভেষজ চিকিৎসা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকার অংশ।
২০২৫ সালে UNESCO-র আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে এই অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত হওয়া ভারতের পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
৩. মান্নার উপসাগর: সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অন্যতম ভাণ্ডার
তামিলনাড়ুর দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত মান্নার উপসাগর ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংরক্ষণ অঞ্চল।
প্রায় ১০.৫ লক্ষ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে প্রবালপ্রাচীর, সি-গ্রাস বা সামুদ্রিক ঘাসের বিস্তৃতি এবং ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র রয়েছে।
এই সামুদ্রিক পরিবেশে প্রায় ৪,২২৩টি উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির অস্তিত্বের কথা PIB-র তথ্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৪৭টি উপকূলীয় গ্রামের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সুন্দরবন: পশ্চিমবঙ্গের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ
১৯৮৯ সালে ঘোষিত সুন্দরবন জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল ২০০১ সালে UNESCO-র World Network-এ অন্তর্ভুক্ত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র। এর বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ অরণ্য বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং উপকূলীয় পরিবেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই অঞ্চলের বহু মানুষের জীবিকা মাছ ধরা, কৃষিকাজ এবং বন ও জলসম্পদের উপর নির্ভরশীল। তাই সুন্দরবনের সংরক্ষণে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি উপকূলীয় পরিবেশের স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ল্যান্টানা থেকে হাতির ভাস্কর্য: পরিবেশ সংরক্ষণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিনব উদ্যোগ
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায় নীলগিরি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলে।
এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের কারিগররা বন থেকে অপসারণ করা ল্যান্টানা (Lantana camara) গাছের ডালপালা ব্যবহার করে হাতির ভাস্কর্য, আসবাবপত্র এবং বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরি করছেন।
Lantana camara একটি আগ্রাসী বহিরাগত উদ্ভিদ। ভারতের প্রায় ৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বনাঞ্চলে এর বিস্তারের কথা PIB-র তথ্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গাছ ঘনভাবে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং প্রাকৃতিক অগ্নিকাণ্ডের ধরনেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এই উদ্যোগে অপসারিত ল্যান্টানাকে ব্যবহারযোগ্য হস্তশিল্পে রূপান্তরিত করে স্থানীয় শিল্পীদের আয়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
২০২১ সালে ল্যান্টানা দিয়ে তৈরি ১২৫টি জীবন-আকারের হাতির ভাস্কর্য লন্ডনে প্রদর্শিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বেঙ্গালুরু বিমানবন্দর, বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন স্থান এবং রাষ্ট্রপতি ভবনেও এই শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে।
এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, পরিবেশের ক্ষতিকর আগ্রাসী উদ্ভিদ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দক্ষতা ও জীবিকাকে কীভাবে সংরক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জে জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলের ভূমিকা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চলগুলির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।
পার্বত্য অঞ্চলে তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলের অবক্ষয় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অন্যদিকে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ, প্রবালপ্রাচীর এবং সি-গ্রাস বাস্তুতন্ত্র পরিবেশগত পরিবর্তনের চাপে রয়েছে।
PIB-র আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল আরও চরম জলবায়ু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ক্ষতিগ্রস্ত আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
ভবিষ্যতের করণীয়
ভারতের জীবমণ্ডল সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
- জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিধি বাড়ানো।
- ক্ষতিগ্রস্ত প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং আগ্রাসী বহিরাগত উদ্ভিদ নিয়ন্ত্রণ।
- সংরক্ষিত অঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি।
- আধুনিক বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশগত জ্ঞানের সমন্বয়।
- পাহাড়, বন, উপকূল ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি।
- সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা।
উপসংহার: প্রকৃতি সংরক্ষণ ও মানুষের উন্নয়ন পরস্পরের পরিপূরক
ভারতের ১৮টি জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল কেবলমাত্র কিছু সংরক্ষিত প্রাকৃতিক ভূখণ্ড নয়। এগুলি জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মানুষের টেকসই জীবিকার মধ্যে সমন্বয় তৈরির একটি বৃহত্তর মডেল।
এর মধ্যে ১৩টি অঞ্চলের UNESCO-র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভারতের পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগকে বিশ্বমঞ্চে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল দিবস পালনের প্রাক্কালে মূল বার্তাটি স্পষ্ট—প্রকৃতিকে রক্ষা করার অর্থ শুধু বন বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নয়; প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও জীবিকাকেও সুরক্ষিত রাখা।
সরকার, বিজ্ঞানী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ভারতের এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখতে।
তথ্যসূত্র
১. প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB), ভারত সরকার — Biosphere Reserves in India: Celebrating the International Day for Biosphere Reserves, ২ নভেম্বর ২০২৬।
২. পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (MoEFCC), ভারত সরকার।
৩. UNESCO — Man and the Biosphere Programme এবং World Network of Biosphere Reserves।
৪. Convention on Biological Diversity (CBD)।
৫. UNESCO World Network of Biosphere Reserves।
IBG NEWS | পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ বিষয়ক প্রতিবেদন













